টেলিটক ও নগদ কিনতে আগ্রহী বাংলালিংকের মূল কোম্পানি ভিওন। এর মধ্যে সরকার বিক্রি না করলে রাষ্ট্রায়ত্ত মোবাইল অপারেটর টেলিটকের সাথে পার্টনারশিপ বা মার্জার করতে চায় সংস্থাটি। চায় বিটিসিএলের সাথেও অংশীদারিত্ব। এ জন্য নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নানা স্তরে ক্রমাগত দেন-দরবার করে চলেছে কোম্পানিটি। সম্প্রতি বিনিয়োগের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার সারাংশ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে চিঠি দিয়েছে ভিওন। প্রধানমন্ত্রীর সাথে সরাসরি বৈঠক করে তারা প্রস্তাবগুলো দিতে চায়। এরমধ্যে এসব বিষয় নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদের সাথে আলোচনাও করেছে ভিওন। সরকার রাজি হলে শুরুতে ১০০ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের কথা জানিয়েছে তারা।
জানা গেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত মোবাইল অপারেটর টেলিটকের সাথে পার্টনারশিপ বা সেটি নিজেরা কিনে পরিচালনা করতে গত কয়েক বছর দেন-দরবার করে আসছে বাংলালিংকের মূল কোম্পানি ভিওন। এ ছাড়া দু’বছর আগে মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান নগদেও বিনিয়োগ করতে চেয়েছিল তারা। নগদ কিনতে তারা ১ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব দিয়েছিল। ২০২৪ সালের জুনে এ বিষয়ে এমওইউও হয়েছিল দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে। এবার বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের টেলিকম খাতে বিনিয়োগবান্ধব সংস্কারের উদ্যোগের ঘোষণার সাথে এসব উদ্যোগে গতি বাড়িয়েছে ভিওন। তারা টেলিটক ও নগদ কিনে পরিচালনা করতে চায়।
সূত্র জানায়, টেলিটক ও নগদে বিনিয়োগের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার সারাংশ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে সম্প্রতি চিঠি দিয়েছে ভিওন। প্রধানমন্ত্রীর সাথে সরাসরি বৈঠক করে তারা প্রস্তাবগুলো দিতে চায়। এ ছাড়া বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) সাথেও এই বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা করেছে অপারেটরটি। বাংলালিংক-ভিওন প্রতিনিধিরা বিডার চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীর সাথে বৈঠক করেছেন।
বাংলালিংকের একজন ঊর্ধŸতন কর্মকর্তার কাছ থেকে প্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রীর কাছে লেখা চিঠিতে ভিওন উল্লেখ করেছে, সরকার যখন দেশের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ সম্পদগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে মূল্যায়ন করছে, তখন জাতীয় ডিজিটাল অবকাঠামোকে আরো শক্তিশালী করা এবং উদ্ভাবনকে ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে সম্ভাব্য বিভিন্ন উদ্যোগে অংশ নেয়ার সুযোগকে স্বাগত জানায় ভিওন। প্রতিষ্ঠানটি লিখেছে, এ ধরনের সহযোগিতার আওতায় রাষ্ট্রায়ত্ত মোবাইল অপারেটর টেলিটকের সাথে কৌশলগত সমন্বয় এবং বাংলাদেশ ডাক বিভাগের কাছ থেকে ‘নগদ’ অধিগ্রহণের মতো সম্ভাবনাও আলোচনায় থাকতে পারে। ভিওন সেখানে উল্লেখ করে, তাদের ডিজিটাল-ফার্স্ট পরিচালন মডেল, বাস্তবায়ন সক্ষমতা এবং শক্তিশালী মূলধনভিত্তি বাংলাদেশের ডিজিটাল সেবার মানোন্নয়ন, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি সম্প্রসারণ এবং খাতটির দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি আনতে সহায়ক হতে পারে। চিঠিতে তারা শুরুতে ১০০ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের কথা জানিয়েছে।
জানতে চাইলে বাংলালিংকের সিইও ইওহান বুসে নয়া দিগন্তকে জানান, আমরা এখনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিইনি তবে কানেক্টিভিটি ব্যবসাসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগে আমাদের আগ্রহ রয়েছে। আমাদের প্যারেন্ট কোম্পানি ভিওন এবং বাংলালিংক বাংলাদেশে সম্পূর্ণভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং দেশের ডিজিটাল রূপান্তর যাত্রাকে সহায়তা করতে পারে, এমন কৌশলগত বিনিয়োগের সুযোগের জন্য উন্মুক্ত। গত ২১ বছরে আমরা যে ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছি, তার ধারাবাহিকতায় একটি অনুকূল নিয়ন্ত্রক পরিবেশ থাকলে স্বল্পমেয়াদে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখতে অতিরিক্ত ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এফডিআই বিনিয়োগ করতে আমরা আগ্রহী।
তবে প্রধানমন্ত্রীর কাছে ভিওনের লেখা চিঠিতে নগদ অধিগ্রহণের কথা স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। এ ছাড়া রেহান আসিফ আসাদের কাছে বাংলালিংকের দেয়া চিঠিতে বাংলালিংক সিইও নগদে ভিওনের অংশীদারিত্ব বা বড় অঙ্কের বিনিয়োগের বিষয়ে উল্লেখ করেছেন। নগদ নিয়ে বাংলালিংক চিঠিতে উল্লেখ করেছে, ভিওনের অংশীদারিত্ব বা বড় অঙ্কের বিনিয়োগের ফলে বাংলাদেশে উন্নত বৈশ্বিক প্রযুক্তি, বিশ্বমানের ইউজার এক্সপেরিয়েন্স এবং টেলিকম সেবার সাথে আর্থিক সেবার এক গভীর ইন্টিগ্রেশন ঘটবে। তবে এই পুরো প্রক্রিয়াটি সরকারের বিদ্যমান নীতিমালার সামঞ্জস্যতা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার (রেগুলেটরি) অনুমোদন সাপেক্ষে বাস্তবায়িত হবে। নগদের ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স রয়েছে। বাংলালিংক-ভিওন ডিজিটাল ব্যাংকসহই নগদের বিষয়ে আগ্রহী। যদিও বাংলালিংক ‘নোভা’ নামে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্সের জন্য আবেদন করে রেখেছে স্কয়ারের সাথে মিলে।
সূত্র জানিয়েছে, দীর্ঘ সময় ধরে টেলিযোগাযোগ খাতে সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগের (এফডিআই) সঙ্কটের মধ্যে বাংলালিংক-ভিওনের এই আগ্রহকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে সরকার। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানে বলেছেন, আইসিটি এবং টেলিকম সেক্টর একটি থ্রাস্ট সেক্টর। ফান্ডামেন্টালি আমরা তা বিশ্বাস করি এবং আগামী পাঁচ বছরে আমরা এই সেক্টরের সত্যিকারের কন্ট্রিবিউশন দেখতে পাবো। এই সেক্টরের কন্ট্রিবিউশন ১৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়া সম্ভব।
ভিওনের বিনিয়োগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ এ প্রতিবেদকের কাছে বলেন, অনেকেই প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছে। আমরা আলোচনা করছি। দেশ ও জনগণের যেভাবে মঙ্গল হয়, সেভাবেই সরকার কাজ করবে।
২০২৪ সালে নগদের সাথে ভিওন যে আলোচনা শুরু করেছে সেটি স্বীকার করেছেন নগদের সাবেক এমডি তানভীর এ মিশুক। তিনি জানিয়েছেন, ওই আলোচনা অনেকটা এগিয়ে গেলেও পরিবর্তীত পরিস্থিতির কারণে আলোচনা তখন আর পরিণতি পায়নি। তবে নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর আবার যোগাযোগ হচ্ছে। সম্ভাব্য কৌশলগত অংশীদারিত্ব নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তানভীর এ মিশুক সরাসরি কারো নাম না বললেও ইঙ্গিত দেন যে, বাংলালিংকের মূল কোম্পানি ভিওন ছাড়াও আরো কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি ও ফিনটেক প্রতিষ্ঠান নগদে বিনিয়োগ বিষয়ে আলোচনার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে নগদের একজন কর্মকর্তা নয়া দিগন্তকে বলেন, আমার হাতেও একটি চিঠি আছে। যেখানে বাংলালিংক সরকারের কাছে নগদ কেনার বিষয়ে তাদের আগ্রহের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, নগদের বর্তমান প্রশাসকও চিঠিটি পেয়েছেন।
জানা গেছে, নগদ পরিচালনায় যুক্তরা ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশ ছেড়ে চলে যায়। এরপর বাংলাদেশ ব্যাংক ওই বছরই ২১ আগস্ট প্রশাসক নিয়োগ দেয় প্রতিষ্ঠানটিতে। নানা আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও নগদের বিশাল গ্রাহক ভিত্তি রয়েছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির সক্রিয় গ্রাহক রয়েছে চার কোটি। যেখানে গড়ে দৈনিক লেনদেন দেড় হাজার কোটি টাকা।
টেলিটকে বিনিয়োগ বা অংশীদারিত্ব নিয়ে বাংলালিংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেছেন, তাদের রয়েছে উচ্চমানের ব্যবসায়িক ও পরিচালন দক্ষতা এবং বিশাল বাজার অভিজ্ঞতা। অন্য দিকে টেলিটকের রয়েছে অবকাঠামোসহ সরকারি প্রতিষ্ঠান হওয়ার অনন্য সুবিধা এবং মূল্যবান স্পেকট্রাম সম্পদ। এই দুই শক্তির মেলবন্ধনে গ্রামীণ এবং দুর্গম অঞ্চলে নেটওয়ার্ক কভারেজ ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাবে। টাওয়ার, স্পেকট্রাম এবং প্রযুক্তির যৌথ ব্যবহারের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকার অবকাঠামোগত বিনিয়োগ সাশ্রয় হবে। এই উদ্যোগটি এক দিকে যেমন রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান টেলিটককে বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে শক্তভাবে ফিরিয়ে আনবে, অন্য দিকে দেশজুড়ে ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির গতিকে বহুগুণ ত্বরান্বিত করবে। ২০২৪ সালে দুই অপারেটরের মধ্যে চালু হওয়া ন্যাশনাল রোমিং ও নেটওয়ার্ক শেয়ারিং পাইলট প্রকল্পকে এই সহযোগিতার প্রাথমিক ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
জানা গেছে, অনেক প্রতিষ্ঠান বেশ কয়েকবছর ধরে টেলিটকে বিপুল বিনিয়োগের আগ্রহী হয়ে আলোচনা করে আসছে। এর মধ্যে ২০২০ সালে সৌদি আরবের আল-জমিয়াহ গ্রুপ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের আলোচনা অনেকদূর এগোবেও শেষ পর্যন্ত তা সফল হয়নি। ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্রন্টেরা হোল্ডিংস প্রাথমিক আগ্রহ দেখিয়েছিল। এ ছাড়া কোরিয়া, চীনসহ কয়েকটি দেশের বিনিয়োগকারীরাও আগ্রহের কথা জানিয়েছে। এবার ভিওন আনুষ্ঠানিকভাবে টেলিটকে বিনিয়োগের আগ্রহ দেখাল।
এ ছাড়াও বাংলালিংক প্রধানমন্ত্রীর কাছে দেয়া চিঠিতে তাদের বিনিয়োগ পরিকল্পনায় সরকারি কোম্পানি বিটিসিএলের সাথে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে ‘ট্রিপল প্লে’ (ভয়েস, ডাটা, আইপিটিভি) এবং ‘কোয়াড্রুপল প্লে’ (মোবাইলসহ সমন্বিত সেবা) চালু নিয়ে আলোচনার প্রস্তাবও দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, বিটিসিএলের ফাইবার অবকাঠামো এবং বাংলালিংকের মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ওটিটি প্ল্যাটফর্ম টফি একত্রিত হলে একক ডিজিটাল সেবার মাধ্যমে গ্রাহকদের অভিজ্ঞতা উন্নত হতে পারে। এরআগে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে এনটিটিএন লাইসেন্সও চেয়েছিল বাংলালিংকের মূল কোম্পানি ভিওন।
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম নয়া দিগন্তকে বলেন, প্রযুক্তি খাতে বিভিন্ন নামীদামি কোম্পানি কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এটা ঠিক, সরকারের পক্ষ থেকে বিনিয়োগও খোঁজা হচ্ছে। অনেকেই আমাদের সাথে যোগাযোগ করছেন। এর মধ্যে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে টেলিটককে। যদি পাঁচ থেকে ছয় হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ পাওয়া যায়, তাহলে টেলিটককে গ্রামীণফোন ও রবির মতো শক্তিশালী প্রতিযোগী হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে পারে। অন্যান্য খাতেও দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ হতে পারে।



