বাজেট ঘিরে বাড়ছে নিত্যপণ্যের মজুদদারি কৃত্রিম সঙ্কটের শঙ্কা

বাজেট ২০২৬

শাহ আলম নূর
Printed Edition

জাতীয় বাজেটকে সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন পাইকারি বাজার, গুদাম ও সরবরাহ ব্যবস্থায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মজুদদারির প্রবণতা বাড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। চাল, ভোজ্যতেল, চিনি, ডাল ও পেঁয়াজসহ বিভিন্ন পণ্যের বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ব্যবসায়ী সংগঠন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর এবং বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রতি বছর বাজেট ঘোষণার আগে শুল্ক ও কর কাঠামো পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী অতিরিক্ত মজুদ করে বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করার চেষ্টা করে। এতে সাধারণ ভোক্তাদের বাড়তি মূল্য গুনতে হয়।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলতি অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে এসে দেশের খাদ্য ও ভোগ্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা আবারো মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। রাজধানীর কারওয়ান বাজার, শ্যামবাজার, চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ এবং দেশের বিভিন্ন আঞ্চলিক পাইকারি বাজারে বেশ কয়েকটি পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও খুচরা বাজারে দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায়, খাদ্য মূল্যস্ফীতি এখনো সাধারণ মানুষের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। গত কয়েক মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার ৮ থেকে ৯ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি হলে এই চাপ আরো বাড়তে পারে।

এদিকে ব্যবসায়ীদের একটি অংশের দাবি, বাজেটে আমদানি শুল্ক, অগ্রিম কর বা ভ্যাট বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এমন পরিস্থির সুযোগ নেয়ার জন্য বেশ কিছু অসাধু আমদানিকারক ও বড় পাইকাররা আগেভাগে পণ্য গুদামজাত করে রাখেন। এতে বাজারে সরবরাহ কমে যায় এবং মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হয়। যদিও ব্যবসায়ী নেতারা আনুষ্ঠানিকভাবে মজুদদারির অভিযোগ অস্বীকার করেন।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত কয়েক সপ্তাহে রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় ভোজ্যতেল, চিনি ও ডালের মজুদ বৃদ্ধি পেয়েছে। কিছু বড় গুদামে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি পরিমাণ পণ্য সংরক্ষণের তথ্যও পেয়েছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন, তারা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছেন এবং অস্বাভাবিক মজুদ শনাক্তে কাজ করছেন।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর তথ্যমতে, দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির পেছনে আন্তর্জাতিক বাজার, ডলার সঙ্কট ও পরিবহন ব্যয়ের পাশাপাশি অসাধু মজুদদারিরও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। সংস্থাটির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অনেক সময় আমদানি ব্যয় কমলেও বাজারে তার সুফল ভোক্তারা পান না। এদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ২৫ লাখ টনের বেশি ভোজ্যতেল, ১৮ থেকে ২০ লাখ টন চিনি এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ডাল আমদানি করা হয়। এসব পণ্যের বড় অংশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাজারজাত হয়। ফলে সরবরাহ ব্যবস্থার নির্দিষ্ট পর্যায়ে পণ্য আটকে গেলে পুরো বাজারে প্রভাব পড়ে।

দেশের পাইকারি বাজার মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাজী সৈয়দ মো: বশির উদ্দিন বলেন, বাজেটের আগে বাজারে সব সময়ই এক ধরনের অনিশ্চয়তা কাজ করে। শুল্ক বাড়বে নাকি কমবে, সে হিসাব কষে অনেক ব্যবসায়ী পণ্য ধরে রাখার চেষ্টা করেন। এতে বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়তে শুরু করে। তবে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো সজাগ যাতে পণ্য মজুদ করে বাজারে অস্থিরতা তৈরি করতে না পারে।

কৃষি অর্থনীতিবিদ প্রফেসর গোলাম হাফিজ কেনেডি বলেন, বাংলাদেশে নিত্যপণ্যের বাজার এখনো কয়েকটি বড় আমদানিকারক ও সরবরাহকারীর ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। ফলে প্রতিযোগিতা সীমিত থাকায় বাজার নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি হয়। বাজেট-পূর্ব সময়ে এই প্রবণতা আরো প্রকট হয়ে ওঠে।

তিনি বলেন, প্রতি বছর বাজেটের আগে বাজারে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করা হয়। অনেক ব্যবসায়ী কর বৃদ্ধির সম্ভাবনার কথা বলে আগাম মূল্য বাড়ানোর চেষ্টা করেন। বাস্তবে কর না বাড়লেও ভোক্তারা বাড়তি দাম দিয়ে পণ্য কিনতে বাধ্য হন। তবে সরকারের উচিত বাজারে মজুদের তথ্য ডিজিটাল পদ্ধতিতে পর্যবেক্ষণ করা এবং বড় গুদামগুলোর ওপর নজরদারি বাড়ানো। অন্যথায় কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের প্রবণতা বন্ধ হবে না বলে তিনি মনে করেন।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন, বাজারে পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, খাদ্যপণ্য আমদানিতে গত এক বছরে কয়েক বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়েছে। ডলার সঙ্কট কিছুটা কমলেও আমদানিকারকরা এখনো উচ্চ সুদের ঋণ ও ব্যাংকিং ব্যয়ের চাপের কথা বলছেন। কিন্তু ভোক্তা সংগঠনগুলোর দাবি, এই ব্যয়ের অজুহাতে অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মূল্য আদায় করা হচ্ছে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি, আমদানি উৎস বহুমুখীকরণ এবং পণ্যের মজুদ সম্পর্কিত তথ্য প্রকাশ করা গেলে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরির সুযোগ কমবে।

তিনি বলেন, শুধু জরিমানা বা অভিযান দিয়ে মজুদদারি পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিযোগিতা আইন প্রয়োগ, বাজার তথ্যের স্বচ্ছতা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজেট-পরবর্তী সময়ে যদি কর ও শুল্ক কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে, তাহলে মজুদ করা পণ্য বাজারে ছাড়ার আগে আরো মূল্যবৃদ্ধির চেষ্টা হতে পারে। ফলে সরকারের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট প্রতিরোধ করা এবং সাধারণ ভোক্তাকে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির চাপ থেকে রক্ষা করা।