নয়া দিগন্ত ডেস্ক
পারস্য উপসাগরে স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধে প্রচেষ্টা নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র তীব্র মতবিরোধে লিপ্ত হয়ে আছে বলে ইরানের এক ঊর্ধ্বতন সূত্র জানিয়েছে। রয়টার্সকে তিনি জানিয়েছেন, জুনে স্বারিত অন্তর্বর্তী চুক্তি পুনর্বহাল ও এটি বাস্তবায়ন করার বিষয়ে একটি সময়সীমা নির্ধারণ নিয়ে আলোচনায় কোনো অগ্রগতি হয়নি।
মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের নৌপথে নতুন করে জাহাজে হামলা এবং বুধবার ইরানের নেতাদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তীব্র আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেয়ার পর এই সঙ্কট সমাধানের আশা আরো অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। পুরো সঙ্ঘাতজুড়ে ট্রাম্প এক দিকে সঙ্ঘাত বাড়ানোর হুমকি দিচ্ছেন, আবার পরণেই চুক্তি সন্নিকটে বলে দাবি করছেন।
জুন মাসে দু’প ‘সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে বন্ধের’ ঘোষণা দিয়ে অন্তর্বর্তী চুক্তি করেছিল। তবে দ্রুতই তা বিফলে যায়। ট্রাম্প ৭ জুলাই চুক্তিটি ‘বাতিল’ বলে ঘোষণা দেন এবং এর এক সপ্তাহ পর ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চুক্তিটি ‘স্থগিত’ করার ঘোষণা দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, চুক্তি অনুযায়ী কৌশলগত নৌপথ হরমুজ প্রণালী আবার খুলে দেয়ার অঙ্গীকার রা করেনি ইরান। অন্য দিকে তেহরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে; যার মধ্যে রয়েছে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর থেকে অবরোধ তুলে নেয়া এবং বাজেয়াপ্ত ইরানি সম্পদ মুক্ত করা।
ইরানের সূত্রটি রয়টার্সকে বলেন, ‘মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে হওয়া আলোচনার অন্যতম বিষয় ছিল যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্বর্তী চুক্তিতে ফিরে আসা ও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সময়সীমা নির্ধারণ করা। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি।’ বুধবার ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে দাবি করেন, হরমুজ প্রণালীর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ‘সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ রয়েছে। তিনি ইরানকে উদ্দেশ্য করে লেখেন, ‘ইরান কেবল মুখেই বড় কথা বলে, বাস্তবে কিছু করে না। পশ্চিম এশিয়ায় প্রভাবশালী অবস্থানে তারা আর নেই।’
তবে নৌপথটি ব্যবস্থাপনার জন্য ইরানের গঠন করা ‘পারস্য উপসাগর প্রণালী কর্তৃপ’ জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালী এখনো বন্ধ রয়েছে এবং ইরানের দেয়া শর্ত না মানা পর্যন্ত এটি খোলা হবে না।
জুনের অন্তর্বর্তী চুক্তিতে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, দু’পরে সম্মতিতে মেয়াদ বাড়িয়ে ৬০ দিনের মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তোলার একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানো হবে। তুরস্কের বার্তা সংস্থা আনাদোলু পাকিস্তানি সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে দাবি করেছিল, দু’প ওই ৬০ দিনের মেয়াদ বাড়াতে সম্মত হয়েছে। তবে ইরানি সূত্রটি রয়টার্সের কাছে সে দাবি পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে।
তিনি বলেন, ‘মেয়াদ বাড়ানোর কোনো প্রশ্নই ওঠে না। কারণ ইরানের দিক থেকে কোনো নির্দিষ্ট মেয়াদকাল আদৌ শুরুই হয়নি, তাই তা বাড়ানোর কিছু নেই। চুক্তি হওয়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র তা লঙ্ঘন করে এবং তার কয়েক দিন পর বের হয়ে যায়।’
‘যুক্তরাষ্ট্র ভুল হিসাব করছে’
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি বলেছেন, গোয়েন্দা তথ্যের ব্যর্থতার কারণে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন বিষয়ে ‘ভুল হিসাব’ করে আসছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর েেত্রও একই ধরনের ভুল করেছে ওয়াশিংটন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে আরাকচি বলেন, হরমুজ প্রণালীতে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক পদপে আরো বড় ধরনের ভুল হিসাবের উদাহরণ। তিনি বলেন, ভুয়া খবরের চেয়েও ভয়ঙ্কর হলো ভুয়া গোয়েন্দা তথ্য।
বড় হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন ট্রাম্প, দাবি বিশেষজ্ঞের
ইরানের সাথে চলমান সঙ্ঘাত অবসানের পথ খুঁজছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে একই সময়ে ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক হামলার প্রস্তুতিও নেয়া হচ্ছে বলে দাবি করেছেন তেহরানের ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লায়েড সায়েন্সেসের অধ্যাপক মোস্তফা খোশচেশম। আলজাজিরাকে দেয়া এক সাাৎকারে তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার েেত্র ব্যর্থ হওয়ার পর ট্রাম্প এমন একটি পথ খুঁজছেন, যার মাধ্যমে সঙ্ঘাতের অবসান ঘটানো যাবে এবং তাকে পরাজয় স্বীকার করতে হবে না।
খোশচেশমের মতে, বাস্তব পরিস্থিতি তার বিপে গেলেও ট্রাম্প কখনোই নিজেকে পরাজিত হিসেবে উপস্থাপন করেন না। তাই সঙ্ঘাত থেকে বেরিয়ে যাওয়ার এমন একটি ‘দরজা’ খুঁজছেন তিনি, যেটিকে রাজনৈতিকভাবে বিজয় হিসেবে তুলে ধরা সম্ভব হবে। খোশচেশম বলেন, মাঠের বাস্তবতায় যা-ই ঘটুক না কেন, ট্রাম্প কখনো বলবেন না যে, তিনি পরাজিত হয়েছেন।
তার ভাষ্য, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারবার এমন একটি পথ খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন, যার মাধ্যমে তিনি সঙ্ঘাতের অবসান ঘটিয়ে নিজেকে বিজয়ী হিসেবে উপস্থাপন করতে পারবেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেই প্রচেষ্টা সফল হয়নি। তিনি বলেন, তিনি বিজয় দাবি করে বেরিয়ে যাওয়ার একটি দরজা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু বারবার ব্যর্থ হয়েছেন।
হরমুজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ট্রাম্পের দাবি ইরানের প্রত্যাখ্যান
হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যে দাবি করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, তা প্রত্যাখ্যান করেছে দেশটির সামরিক বাহিনীর অভিজাত শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। গত ১১ আগস্ট মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরা বাহিনীর ঘাঁটি জয়েন্ট বেইস অ্যান্ড্রুজ পরিদর্শনের সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, ইরান ইস্যুতে আমরা ভালোভাবে এগোচ্ছি, খুবই ভালোভাবে এগোচ্ছি। হরমুজ প্রণালী এখন আমরা নিয়ন্ত্রণ করছি। ওই প্রণালী সম্পূর্ণ আমাদের নিয়ন্ত্রণে আছে। আমাদের নৌবাহিনী অবিশ্বাস্য এবং ভবিষ্যতে যা ঘটবেÑ তা আমাদের দেশের জন্য ভালো হবে।
ট্রাম্পের এ বক্তব্যের পর রেভল্যুশনারি গার্ড মুখপাত্রদের সাথে যোগাযোগ করেছিল এএফপি। আইআরজিসির অন্যতম মুখপাত্র এবং অঙ্গসংস্থা বাসিজ আধা সামরিক বাহিনীর প্রধান হোসাইন তায়েব মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, পরমাণু প্রকল্প ইস্যুতে যুদ্ধে নেমে কাবু হওয়ার পর এখন হরমুজ প্রণালীকে ইস্যু করে ফের সঙ্ঘাত শুরু করতে চাইছেন ট্রাম্প। তিনি দাবি করেছিলেন যে ইরানের কোনো বিমানবাহিনী বা নৌবাহিনী নেই, তার পরও যুক্তরাষ্ট্র পরাজিত হয়েছে। এখন তিনি হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিতে চান। হরমুজ প্রণালী ইরানের ইসলামী প্রজাতান্ত্রিক সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনার অধীনে আছে এবং ভবিষ্যতেও তা-ই থাকবে।


