রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও স্থানীয় প্রশাসনের চোখের সামনেই ঢাকার চারপাশের বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল (ফ্লাড ফ্লো জোন) বা প্রাকৃতিক জলাধারগুলো আশঙ্কাজনক হারে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। প্রভাবশালী ভূমিদস্যু গোষ্ঠী ও আবাসন কোম্পানিগুলোর এই আগ্রাসনে প্রধান সহযোগী হিসেবে কাজ করছে একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা। শুধু বেসরকারি খাতই নয়, খোদ নিয়ন্ত্রক সংস্থা রাজউক নিজেই একাধিক মেগা প্রকল্পে বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল দখল করে আবাসন তৈরি করেছে। মূলত বর্ষা মৌসুমে রাতে বালু ফেলে এসব নিচু এলাকা রাতারাতি ভরাট করা হয়। একবার ভরাট হয়ে জনবসতি গড়ে উঠলে, পরে নানামুখী রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপে বাধ্য হয়েই নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো এসব অবৈধ স্থাপনাকে অনুমোদনের আওতায় নিয়ে আসে।
ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) অনুযায়ী, রাজউকের আওতাধীন ১ হাজার ৫২৮ বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্যে একটি বড় অংশ বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত। তবে ২০২২-২০৩৫ মেয়াদের সংশোধিত ড্যাপে মূল বা প্রধান বন্যাপ্রবাহ অঞ্চলের পরিমাণ কমিয়ে মোট আয়তনের মাত্র ১৩ থেকে ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। ড্যাপের মানচিত্রে ঢাকার পূর্বাঞ্চলের খিলগাঁও ও ডেমরা; উত্তরাঞ্চল ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের আশুলিয়া, সাভার ও তুরাগ তীরবর্তী এলাকা এবং দক্ষিণাঞ্চলের কেরানীগঞ্জ ও ফতুল্লা (বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরী সংলগ্ন) এলাকাকে প্রধান বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়া রূপগঞ্জ ও বালু নদীর তীরবর্তী নিচু জমিও এর অন্তর্ভুক্ত। আইন অনুযায়ী, এসব মূল বন্যাপ্রবাহ অঞ্চলে যেকোনো ধরনের মাটি ভরাট বা স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
জলবায়ু বিপর্যয় ও কৃত্রিম বন্যা
পরিকল্পনাহীন ভূমি ব্যবহার এবং পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়াই জলাভূমি ভরাটের কারণে ঢাকার প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। বর্ষা মৌসুমে বা ভারী বৃষ্টিপাতে ঢাকা শহরের পানি যে দিক দিয়ে নেমে যাবে, সেই পথগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে বৃষ্টির পানি নদীতে যেতে না পেরে শহরের বুকেই আটকে থাকছে, যা রূপ নিচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র জলাবদ্ধতায়। পরিবেশবিজ্ঞানীদের মতে, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে অদূর ভবিষ্যতে ঢাকা অববাহিকায় কেবল সাধারণ জলাবদ্ধতাই নয়, বরং মারাত্মক পরিবেশগত বিপর্যয় এবং জলবায়ুজনিত তীব্র আকস্মিক বন্যার (ফ্ল্যাশ ফ্লাড) ঝুঁকি তৈরি হবে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাবেক সভাপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান এ প্রসঙ্গে বলেন, “নদী, খাল, জলাভূমি ও বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল সংরক্ষণ করতে না পারলে টেকসই নগরায়ণ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা অসম্ভব। ঢাকাকে বাঁচাতে হলে এসব অঞ্চলের বিকল্প নেই। কিন্তু দুঃখের বিষয়, স্বয়ং রাজউকই আইন লঙ্ঘন করে কেরানীগঞ্জের ঝিলমিল আবাসিক এলাকা, রূপগঞ্জের পূর্বাচল প্রকল্পের একাংশ এবং উত্তরা তৃতীয় পর্বের কিছু অংশ বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল ভরাট করে গড়ে তুলেছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার এই দ্বিমুখী নীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।” তিনি আরো যোগ করেন, “যারা অবৈধভাবে জলাশয় ভরাট করে, তারা স্থানীয় প্রশাসন ও রাজউকের একশ্রেণীর কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করেই কাজটা করে। সাভারের নামাবাজার বা ঢাকার মধুমতি মডেল টাউনের মতো প্রকল্পগুলো বছরের পর বছর ধরে আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনের নাকের ডগায় ভরাট হয়েছে; এমনকি রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলেও এই চক্রকে পুরোপুরি থামানো যায়নি। এই অপরাধ রুখতে হলে ভরাটকারীদের ওপর নিয়মিত ভারী আর্থিক জরিমানার পাশাপাশি কঠোর শারীরিক দণ্ড বা কারাদণ্ড আরোপ করতে হবে।”
রাজউকের সীমাবদ্ধতা ও আইনি শূন্যতা
ভূমিদস্যুদের কৌশল অত্যন্ত চতুর। বর্ষাকালে নদী ও নৌপথ ব্যবহার করে ড্রেজারের মাধ্যমে অত্যন্ত কম সময়ে ও কম খরচে রাতারাতি লাখ লাখ কিউবিক ফুট বালু ফেলে জলাশয়কে উঁচু ভিটিতে রূপান্তর করা হয়। রূপগঞ্জ ও কেরানীগঞ্জের বিস্তীর্ণ এলাকায় এখন এই দৃশ্য নিত্যদিনের।
এই প্রশাসনিক ব্যর্থতার বিষয়ে জানতে চাইলে রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো: আশরাফুল ইসলাম বলেন, “রাজউক নিয়মিত এসব অবৈধ ভরাটের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট বা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যখন আমাদের ম্যাজিস্ট্রেট ও টিম ভরাটস্থলে যায়, তখন সেখানে জমির কোনো প্রকৃত মালিক খুঁজে পাওয়া যায় না। সাময়িকভাবে কাজ বন্ধ করে বা মামলা দিয়ে আসার পর, কিছুদিন পর আবারও রাতের অন্ধকারে ড্রেজার চালু করা হয়।”
বন্যাপ্রবাহ অঞ্চলে পরবর্তী সময়ে রাজউক কেন নকশা বা প্ল্যান অনুমোদন দেয়- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “রাজউক নীতিগতভাবে বন্যাপ্রবাহ অঞ্চলে কোনো ভবনের অনুমোদন দেয় না। কিন্তু সেখানে রাজউকের অনুমোদন ছাড়াই শত শত বহুতল ভবন ও স্থাপনা উঠে যাচ্ছে। এই অবৈধ দখলদারি স্থায়ীভাবে ঠেকাতে হলে সরকারকে কঠোর হতে হবে। ঢাকার চার পাশের প্রধান ও সংবেদনশীল বন্যাপ্রবাহ অঞ্চলগুলোকে চিহ্নিত করে, সরকার আইন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দিয়ে সেসব জমি রাষ্ট্রীয়ভাবে অধিগ্রহণ (ল্যান্ড অ্যাকুইজিশন) করে নিতে পারে। তবেই এগুলো রক্ষা পাবে।”
টেকসই সমাধানের দাবি
নগর বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, ঢাকা এখন একটি ‘কংক্রিটের তাপদ্বীপে’ (আরবান হিট আইল্যান্ড) পরিণত হয়েছে। বন্যা প্রবাহ অঞ্চলগুলো কেবল পানি নিষ্কাশনই করে না বরং শহরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখে। অবিলম্বে যদি পরিবেশ আইন ও ড্যাপের বিধিনিষেধ কঠোরভাবে বাস্তবায়ন না করা হয়, তবে ঢাকার জলাবদ্ধতা সমস্যা কেবল বর্ষাকালের দুর্ভোগে সীমাবদ্ধ থাকবে না, তা সামগ্রিক নাগরিক জীবন ও অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেবে। ঢাকা ও এর চার পাশের বাসযোগ্যতা টিকিয়ে রাখতে কথার চেয়ে রাজউক ও পরিবেশ অধিদফতরের দৃশ্যমান ও আপসহীন আইনি পদক্ষেপই এখন সময়ের দাবি।



