বিশেষ সংবাদদাতা
জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ উপলক্ষে প্রস্তাবিত অর্থ বিলে আয়কর আইন, ২০২৩-এর বিভিন্ন ধারা ও তফসিলে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। এসব পরিবর্তনের মাধ্যমে এক দিকে যেমন অপ্রদর্শিত সম্পদ ও রিয়েল এস্টেট লেনদেনকে করের আওতায় আনার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে, অন্য দিকে স্টার্টআপ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, উৎপাদনমুখী শিল্প এবং প্রযুক্তিভিত্তিক উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সুবিধা ও কর-প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছে।
অপ্রদর্শিত সম্পদ স্বপ্রণোদিত ঘোষণার সুযোগ : সবচেয়ে আলোচিত পরিবর্তন এসেছে ‘আয় ও বিনিয়োগের স্বপ্রণোদিত প্রদর্শন’ বিষয়ে। নতুন বিধানে করদাতা স্বেচ্ছায় জমি, ভবন বা অ্যাপার্টমেন্ট ক্রয়-বিক্রয়ের প্রকৃত মূল্য ঘোষণা করলে সেই অর্থের উৎস নিয়ে কর কর্তৃপক্ষ প্রশ্ন তুলতে পারবে না।
যদি কোনো ব্যক্তি দলিল মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সম্পত্তি কিনে থাকেন, তাহলে তিনি অতিরিক্ত অংশের ওপর নিয়মিত হারে আয়কর পরিশোধ করে তা বৈধ করতে পারবেন। একইভাবে বিক্রয়মূল্য দলিলমূল্যের চেয়ে বেশি হলে অতিরিক্ত অর্থের ওপর মূলধনী মুনাফা কর পরিশোধের সুযোগ থাকবে।
তবে কর কর্তৃপক্ষ তদন্ত শুরু করার পর স্বেচ্ছা ঘোষণা দিলে প্রদেয় করের ওপর অতিরিক্ত ২০ শতাংশ কর দিতে হবে। এ ছাড়া দুর্নীতি বা অপরাধমূলক মামলায় অভিযুক্ত বা বিচারাধীন ব্যক্তিরা এ সুবিধা পাবেন না। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কার্যত অপ্রদর্শিত সম্পদকে করের বিনিময়ে বৈধ করার একটি সুযোগ, যদিও সরকার এটিকে কর-অনুগত্য বৃদ্ধির উদ্যোগ হিসেবে ব্যাখ্যা করছে।
উৎপাদন শিল্পে ত্বরিত অবচয় সুবিধা
ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বাইরে নতুন উৎপাদনমুখী শিল্প, পর্যটন ও ক্রীড়া খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে ‘ত্বরিত অবচয় ভাতা’ (অপপবষবৎধঃবফ উবঢ়ৎবপরধঃরড়হ অষষড়ধিহপব) পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে।
নতুন বিধান অনুযায়ী- বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর প্রথম বছরে যন্ত্রপাতির মূল্যের ৬০ শতাংশ অবচয় সুবিধা পাওয়া যাবে। দ্বিতীয় বছরে অবশিষ্ট ৪০ শতাংশ অবচয় সুবিধা দেয়া হবে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত ও পরিশোধিত মূলধন কমপক্ষে ২০ কোটি টাকা হতে হবে। প্রতিষ্ঠানকে টিআইএনধারী হতে হবে এবং নিয়মিত হিসাব সংরক্ষণ ও রিটার্ন দাখিল করতে হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, শিল্পাঞ্চলের বিকেন্দ্রীকরণ ও জেলা পর্যায়ে শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করতে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ডেভেলপার ও ভূমি মালিকদের কর কাঠামো স্পষ্ট
রিয়েল এস্টেট খাতে দীর্ঘদিনের একটি জটিলতা দূর করতে ডেভেলপার ও ভূমি মালিকদের আয় নির্ধারণের পৃথক কাঠামো যুক্ত করা হয়েছে।
আইএফআরএস-১৫ অনুযায়ী ডেভেলপারদের রাজস্ব ও ব্যয় হিসাবায়ন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাশাপাশি ভূমির মালিক ডেভেলপারের কাছ থেকে নগদ অর্থ, ফ্ল্যাট বা অন্য সুবিধা পেলে তা মূলধনী প্রাপ্তি হিসেবে গণ্য হবে এবং মূলধনী মুনাফা কর নির্ধারণ করা হবে। ফলে রিয়েল এস্টেট খাতে কর নির্ধারণে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ফ্রিল্যান্সিং ও কনটেন্ট ক্রিয়েশন স্বীকৃতি
কর অব্যাহতির আওতায় থাকা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের তালিকায় ‘ফ্রিল্যান্সিং’ ও ‘কনটেন্ট ক্রিয়েশন’ স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশের প্রেক্ষাপটে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট নির্মাতারা কর সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে আরো স্পষ্ট আইনি ভিত্তি পাবেন।
এসএমই খাতে কর অব্যাহতির সীমা বৃদ্ধি
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমাও বাড়ানো হয়েছে। নারী ও প্রতিবন্ধী মালিকানাধীন শিল্প প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক টার্নওভার ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত হলে আয় করমুক্ত থাকবে। অন্যান্য এসএমই প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই সীমা ৫০ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে কর সুবিধা পেতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে এসএমই ফাউন্ডেশনে নিবন্ধিত হতে হবে।
স্টার্টআপ স্যান্ডবক্স : নতুন যুগের সূচনা
প্রস্তাবিত সংশোধনীর অন্যতম উল্লেখযোগ্য অংশ হলো ‘স্টার্টআপ স্যান্ডবক্স’ ব্যবস্থা। নিবন্ধিত স্টার্টআপগুলোকে নিম্নোক্ত সুবিধা দেয়া হবে- প্রথম ৯ বছর পর্যন্ত বিশেষ কর সুবিধা। লোকসান হলে তা পরবর্তী ৯ বছর বহন ও সমন্বয়ের সুযোগ। নতুন বিনিয়োগকারী এলেও লোকসান সমন্বয়ের অধিকার বহাল থাকবে। গ্রোথ পিরিয়ডে টার্নওভার কর শূন্য শতাংশ। আয়কর কর্তৃপক্ষকে ‘রিড-অনলি’ ডিজিটাল অ্যাকসেস দিলে অতিরিক্ত রিপোর্টিংয়ের বাধ্যবাধকতা কমে যাবে। এ ছাড়া ‘ডিপ টেক স্টার্টআপ’ হিসেবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (অও), ফিনটেক, গবেষণা ও প্রকৌশলভিত্তিক উদ্ভাবনী প্রতিষ্ঠানকে পৃথকভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।
কল্যাণ তহবিল ও গ্রুপ বীমায় সুবিধা
কোম্পানি, ফার্ম, ব্যক্তিসঙ্ঘ বা হিন্দু অবিভক্ত পরিবার কর্তৃক পরিচালিত কর্মচারী কল্যাণ তহবিলের কর সুবিধা আরো স্পষ্ট করা হয়েছে।
অন্য দিকে গ্রুপ বীমা পলিসি থেকে কর্মচারীরা যে অর্থ বা সুবিধা পাবেন, তা ‘অন্যান্য উৎস হতে আয়’ হিসেবে গণ্য হবে না। ফলে এ খাতে করের চাপ কমবে।
জাকাত ব্যবস্থাপনায় কর ছাড়
স্বীকৃত ‘সেন্টার ফর জাকাত ম্যানেজমেন্ট’-এ দানকৃত অর্থকে কর রেয়াতের আওতায় আনা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক জাকাত ব্যবস্থাপনাকে উৎসাহিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
২০৩০-৩১ পর্যন্ত করহার বহাল
প্রস্তাবিত আইনে ২০২৬-২৭ থেকে ২০৩০-৩১ করবর্ষ পর্যন্ত আয়কর, সারচার্জ ও কর রেয়াতের কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে আগামী পাঁচ বছরের জন্য কর ব্যবস্থায় একটি পূর্বানুমানযোগ্য পরিবেশ সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সামগ্রিক মূল্যায়ন
প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকার এক দিকে করজাল সম্প্রসারণ ও অপ্রদর্শিত সম্পদকে করের আওতায় আনতে চেয়েছে, অন্য দিকে শিল্পায়ন, প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তা সৃষ্টি, ফ্রিল্যান্সিং, এসএমই উন্নয়ন এবং রিয়েল এস্টেট খাতে স্বচ্ছতা বৃদ্ধির জন্য একাধিক প্রণোদনা দিয়েছে।
তবে অপ্রদর্শিত সম্পদ বৈধ করার সুযোগকে অনেক অর্থনীতিবিদ ‘নতুন ধরনের কর-অ্যামনেস্টি’ হিসেবে দেখছেন। অন্য দিকে স্টার্টআপ স্যান্ডবক্স, ত্বরিত অবচয় সুবিধা এবং এসএমই কর-সহায়তা দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।



