রফিকের রেকর্ড ভাঙলেন হাসান

Printed Edition
উইকেট নেয়ার পর আকাশের দিকে দুই হাত তুলে তাকিয়ে হাসান মাহমুদ। ৫৫ রানে ৬ অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটারকে প্যাভিলিয়নে পাঠান তিনি : ক্রিকইনফো
উইকেট নেয়ার পর আকাশের দিকে দুই হাত তুলে তাকিয়ে হাসান মাহমুদ। ৫৫ রানে ৬ অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটারকে প্যাভিলিয়নে পাঠান তিনি : ক্রিকইনফো

ক্রীড়া প্রতিবেদক

ডারউইনে ২৩ বছর পর বাংলাদেশের যে উল্লাস, তার বড় অংশজুড়ে ছিলেন পেসার হাসান মাহমুদ। অস্ট্রেলিয়ার মতো দলের বিপে ৫৫ রানে ৬ উইকেট নিয়ে ক্যারিয়ারের সেরা বোলিং করেছেন বাংলাদেশের এই পেসার। স্বাগতিকদের ১৯৮ রানে গুটিয়ে দেয়ার পথে একাই নিয়েছেন ছয়টি উইকেট। আর তাতে এক ইনিংসে মোহাম্মদ রফিককে (৫/৬২) পেছনে ফেললেন হাসান।

অবশ্য দিনের সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপার তার বোলিং ফিগার নয়, বরং সেই বোলিংয়ের ব্যাখ্যা। ৬ উইকেটের পরও হাসানের মুখে নেই কোনো বড় দাবি। নেই নিজের কৃতিত্ব জাহির করার চেষ্টা; বরং তার কথায় ফিরে এসেছে ক্রিকেটের সবচেয়ে পুরনো কিছু শব্দ-মনোযোগ, লাইন, লেন্থ, প্রক্রিয়া আর অধিনায়কের নির্দেশ!

দলের সাথে মাঠ ছাড়ার সময় কিংবদন্তি অ্যাডাম গিলক্রিস্টের কাছে হাসান বলেছেন, ‘অস্ট্রেলিয়ার মাঠে খেলার জন্য মুখিয়ে ছিলাম। তারা বিশ্বের অন্যতম সেরা দল। এসব কন্ডিশনে খেলার সুযোগ পাওয়া দারুণ ব্যাপার। আমি শুধু বলটা সঠিক লাইন ও লেন্থে রাখার চেষ্টা করেছি। নিজের প্রক্রিয়া ঠিক রাখার দিকে মন দিয়েছি। অধিনায়কের নির্দেশনা শোনার চেষ্টা করেছি।’

এই ‘শুধু’ শব্দটির ভেতরেই যেন লুকিয়ে আছে হাসানের ডারউইন-দাপট। কারণ তার সেই লাইন-লেন্থই অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটারদের জন্য হয়ে উঠেছিল সবচেয়ে বড় সমস্যা। প্রথমে জ্যাক ওয়েদারাল্ড, এরপর ট্রাভিস হেডÑ দু’জনকেই ফিরিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসে প্রথম বড় ধাক্কা দেন তিনি!

দ্বিতীয় সেশনে ফিরে প্যাট কামিন্স ও মিচেল স্টার্ককে পরপর শিকার বানিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ আরো শক্ত করে নেন হাসান। দুই সেশনে ৪ উইকেট। এরপর শেষ সেশনে অপো করছিল আরো বড় মুহূর্ত। ৭১ রান করা স্টিভেন স্মিথ তখন অস্ট্রেলিয়ার শেষ বড় ভরসা। ২ রানে জীবন পাওয়া স্মিথ এক প্রান্ত আগলে লড়াই করছিলেন। হাসানের শর্ট বলে বড় শট খেলতে গিয়ে যখন আকাশে বল তুলে দিলেন, তখনই পূর্ণ হলো পাঁচ উইকেট। পরের ওভারে নাথান লায়নকে ফিরিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসের শেষটাও লেখেন তিনি।

৫৫ রানে ৬ উইকেট। অস্ট্রেলিয়ার বিপে টেস্টে বাংলাদেশের কোনো বোলারের সেরা বোলিং। ১৫ ম্যাচের টেস্ট ক্যারিয়ারে তৃতীয়বারের মতো ইনিংসে পাঁচ বা ততোধিক উইকেট পূর্ণ করেন হাসান। ইনিংসে ১৭ ওভার বল করে ৫৫ রানের বিনিময়ে ৬ উইকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার বিপে টেস্টে বাংলাদেশী বোলার হিসেবে সেরা বোলিংয়ের রেকর্ড গড়েন তিনি। এত দিন এই রেকর্ডের মালিক ছিলেন রফিক। ২০০৬ সালের এপ্রিলে অস্ট্রেলিয়ার বিপে ফতুল্লা টেস্টের প্রথম ইনিংসে ৩২.২ ওভার বল করে ৬২ রানে ৫ উইকেট নিয়েছিলেন রফিক। ২০ বছর পর রফিকের রেকর্ড ভাঙলেন ২৬ বছর বয়সী হাসান। তার সাফল্যের আরেকটি দিক হলো বৈচিত্র্য। প্রচলিত সিম বোলিংয়ের পাশাপাশি সিম ব্যবহার করেছেন কার্যকরভাবে। অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনে সেই বোলিংই হয়ে উঠেছিল তার বড় অস্ত্র।

তবে হাসানের এই পারফরম্যান্সকে শুধু ডারউইনের এক দিনের গল্প বললে ভুল হবে। গত জুনে কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপে চার ইনিংসে ১২ উইকেট নিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করেছিলেন তিনি। ল্যাঙ্কাশায়ারের বিপে ৬৯ রানে ৬ উইকেটও ছিল সেই অভিযানের অংশ। তার পারফরম্যান্সে মুগ্ধ হয়ে কেন্ট তাকে আরো চার ম্যাচের জন্য চুক্তিবদ্ধ করেছে। ইংল্যান্ডের অভিজ্ঞতা যে তাকে আরো পরিণত করেছে, সেটিও অকপটে জানিয়েছেন হাসান, ‘কাউন্টি ক্রিকেটে খেলা, ইংল্যান্ডে খেলা আমার জন্য খুব ভালো অভিজ্ঞতা ছিল। আশা করি, কেন্টের হয়ে নিয়মিত খেলতে পারব।’

ডারউইনে হাসানের সাথে তাসকিন আহমেদ ও ইবাদত হোসেনও ছিলেন সমান গুরুত্বপূর্ণ। দু’জনের দু’টি করে উইকেটে অস্ট্রেলিয়ার ১০ উইকেটই গেছে বাংলাদেশের পেসারদের হাতে। টেস্টে দ্বিতীয়বারের মতো প্রতিপরে পুরো ইনিংস পেসারদের দিয়ে শেষ করার কীর্তি গড়েছে বাংলাদেশ। সতীর্থদের অবদান ভুলে যাননি হাসানও। ‘তাসকিন-ইবাদত দারুণ বোলিং করেছে। সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। চমৎকার বোলিং পার্টনারশিপ হয়েছে। সকালে ময়েশ্চার থাকলেও সিম মুভমেন্ট হয়েছে।’

এক দিকে অস্ট্রেলিয়ার ১৯৮ রানে পতন, অন্য দিকে হাসানের ৬/৫৫-স্কোরকার্ড হয়তো তার দিনটিকে বড় করে দেখাবে। কিন্তু হাসানের নিজের ভাষ্য আরো সরল। তিনি শুধু নিজের কাজটুকু ঠিকভাবে করার চেষ্টা করেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে কাউন্টি, ভাইটালিটি ব্লাস্ট, ইংল্যান্ড ও ওয়েলস ক্রিকেট আয়োজিত টুনামেন্ট। লঙ্কা প্রিমিয়ার লিগ থেকে শুরু করে প্রস্তুতি ম্যাচ সব জায়গায় বল হাতে যে ধারাবাহিকতা দেখা গেছে, ডারউইনে এসে সেটিই যেন পূর্ণতা পেল। আর সেই পূর্ণতার নাম ৫৫ রানে ৬ উইকেট; অথচ সাদামাটা উত্তর, সাফল্যের রহস্যও খুব সাধারণÑ ‘বলটা সঠিক লাইন ও লেন্থে রাখতে চেয়েছি’।

হাসানের এই ছয় উইকেটের পেছনে সাফল্যের ভাগীদার লিটন দাসও। চারজন অসি ব্যাটার ফিরেছেন উইকেটের পেছনে লিটনের ক্যাচে। একটি উইকেট পেয়েছেন কারো সাহায্য ছাড়া সরাসরি বোল্ড করে। বাকি উইকেট পেয়েছেন তানজিদ হাসানের ক্যাচে।