বিশেষ সংবাদদাতা
দীর্ঘদিন পর আবারো দেশে চালু হতে যাচ্ছে বহুল আলোচিত ‘সম্পদ কর’। আগামী ২০২৬-২৭ করবর্ষ থেকে এ কর কার্যকর করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে ‘সম্পদ কর আইন, ২০২৬’-এর নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। নতুন ব্যবস্থায় একজন ব্যক্তির নিট সম্পদের পরিমাণ যত বেশি হবে, তার ওপর করের হারও তত বেশি প্রযোজ্য হবে।
প্রস্তাবিত আইনে নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত নিট সম্পদের ওপর ধাপভিত্তিক হারে ০.২৫ শতাংশ, ০.৫০ শতাংশ, ০.৭৫ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ ১ শতাংশ পর্যন্ত সম্পদ কর আরোপের বিধান রাখা হয়েছে। আজ জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত বাজেটে এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
সরকারের মতে, সংবিধানে ঘোষিত সামাজিক ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক সমতা এবং জাতীয় সম্পদের ন্যায্য বণ্টনের রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই সম্পদের ওপর প্রগতিশীল কর আরোপের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। অতীতে বাংলাদেশে সম্পদ করের বিধান থাকলেও কর প্রশাসনের সীমাবদ্ধতা, সম্পদ মূল্যায়নের জটিলতা, তুলনামূলক কম রাজস্ব আহরণ এবং বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হওয়ার আশঙ্কায় তা বিলুপ্ত করা হয়।
যদিও পরবর্তীকালে আয়কর আইনের আওতায় সম্পদ ও দায়ের বিবরণী দাখিলের বাধ্যবাধকতা বহাল ছিল, তবে পৃথক সম্পদ কর আরোপের বিধান আর কার্যকর ছিল না।
অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি) মনে করে, বর্তমান সময়ে দেশে সম্পদ বৈষম্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে নগরভিত্তিক স্থাবর সম্পদ, আর্থিক সম্পদ ও বিলাসবহুল সম্পদের বড় অংশ সীমিতসংখ্যক মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। একই সাথে কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি, টেকসই রাজস্ব আহরণ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অর্থায়ন এবং কর ব্যবস্থায় ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তাও বেড়েছে।
এ প্রেক্ষাপটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে। কমিটি বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা, বাংলাদেশের কর কাঠামো, সম্পদ বৈষম্যের প্রবণতা এবং কর প্রশাসনের সক্ষমতা পর্যালোচনা করে সুপারিশ প্রদান করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে ই-রিটার্ন ব্যবস্থা, জাতীয় পরিচয়পত্রভিত্তিক তথ্যসমন্বয়, ব্যাংকিং তথ্যভাণ্ডার এবং সম্পদ নিবন্ধন ব্যবস্থার ডিজিটাল সম্প্রসারণের ফলে আগের থেকে অধিক স্বচ্ছ ও কার্যকরভাবে সম্পদ কর প্রশাসন পরিচালনা করা সম্ভব।
আয় অনুযায়ী করের সর্বোচ্চ সীমা
নতুন আইনে এমন ব্যবস্থা রাখা হয়েছে যাতে আয়কর ও সম্পদ কর মিলিয়ে কোনো করদাতার মোট করদায় তার আর্থিক সামর্থ্যরে বাইরে না যায়।
২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ করবর্ষে বার্ষিক আয় তিন লাখ ৭৫ হাজার টাকার কম হলে সম্পদ কর প্রযোজ্য হবে না। আয় তিন লাখ ৭৫ হাজার থেকে ১৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকার মধ্যে হলে আয়কর ও সম্পদ কর মিলিয়ে মোট করদায় আয়ের ২৫ শতাংশের বেশি হবে না। আয় ১৫ লাখ ৭৫ হাজার থেকে ৩৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকার মধ্যে হলে এ সীমা হবে ৩০ শতাংশ এবং এর বেশি হলে ৩৫ শতাংশ।
২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ করবর্ষে করমুক্ত আয়ের সীমা হবে চার লাখ টাকা। আর তিন কোটি টাকার বেশি আয়ের ক্ষেত্রে আয়কর ও সম্পদ কর মিলিয়ে মোট করদায় আয়ের সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারবে।
২০৩০-৩১ করবর্ষে করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়িয়ে চার লাখ ৫০ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ সময়ও উচ্চ আয়ের করদাতাদের জন্য সর্বোচ্চ করদায়ের সীমা ৪০ শতাংশ রাখা হয়েছে।
সম্পদ করের প্রধান বৈশিষ্ট্য
প্রস্তাবিত ‘সম্পদ কর আইন, ২০২৬’-এ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
প্রথমত, নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত নিট সম্পদের ওপর প্রগতিশীল হারে কর আরোপ করা হবে; অর্থাৎ যার সম্পদ বেশি, তার করের হারও বেশি হবে।
দ্বিতীয়ত, সম্পদের সংজ্ঞার আওতায় স্থাবর সম্পদ, অস্থাবর সম্পদ, আর্থিক পরিসম্পদ এবং স্পর্শাতীত সম্পদ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে আধুনিক অর্থনীতিতে বিদ্যমান বিভিন্ন ধরনের সম্পদ কর কাঠামোর আওতায় আনা সম্ভব হবে।
তৃতীয়ত, কর নির্ধারণ করা হবে নিট সম্পদের ভিত্তিতে; অর্থাৎ মোট সম্পদ থেকে অনুমোদিত ঋণ ও দায় বাদ দিয়ে প্রকৃত সম্পদের পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে। এতে করদাতার প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতার ভিত্তিতে কর আরোপ নিশ্চিত হবে।
তবে কৃষিজমি, নির্দিষ্ট সঞ্চয়পত্র, পেনশন তহবিলসহ কিছু সম্পদের ক্ষেত্রে কর অব্যাহতির সুযোগ রাখা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, নতুন সম্পদ কর ব্যবস্থা এক দিকে রাজস্ব আহরণ বাড়াবে, অন্য দিকে সম্পদ বৈষম্য কমানো এবং কর ব্যবস্থায় ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখবে। সরকার আশা করছে, বিদ্যমান আয়কর প্রশাসনিক কাঠামো ব্যবহার করেই এ আইন বাস্তবায়ন সম্ভব হবে; ফলে নতুন কোনো পৃথক প্রশাসনিক অবকাঠামো গঠনের প্রয়োজন হবে না।



