বিশেষ সংবাদদাতা
- বিনিয়োগ ও সঞ্চয় হ্রাসে দায়ী এডিপি বাস্তবায়নে শ্লথগতি ও দুর্বল পরিবেশ
- জিডিপি বেড়ে ৪.১৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, মাথাপিছু আয় তিন হাজার ২০ ডলার
ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অর্ধ ট্রিলিয়ন বা ৫০০ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫০১ বিলিয়ন বা অর্ধ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। পাশাপাশি মাথাপিছু আয় তিন হাজার ডলারের কোটা ছাড়িয়েছে। কিন্তু উৎসবের এই আলোয় দীর্ঘ ছায়া ফেলছে বিনিয়োগ ও সঞ্চয়ের ক্রমাবনতি। শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধির ধীরগতি এবং জিডিপির অনুপাতে বিনিয়োগ ও সঞ্চয় উভয়ের পতন দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ জাগিয়ে তুলছে। বুধবার এই তথ্য প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)।
জিডিপির আকার ও প্রবৃদ্ধি
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের নতুন বাজেট ঘোষণার ঠিক আগের দিন বিবিএস চলতি অর্থবছরের সাময়িক জিডিপি হিসাব প্রকাশ করেছে। সেই হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চলতি মূল্যে জিডিপির আকার দাঁড়িয়েছে ৬১ লাখ ২০ হাজার ২০৯ কোটি টাকা, যা মার্কিন ডলারে ৫০১ বিলিয়ন। এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপির আকার ছিল ৫৫ লাখ ১৫ হাজার ২৬ কোটি টাকা বা ৪৫৬ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে দেশের অর্থনীতি ৪৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বিস্তৃত হয়েছে।
প্রবৃদ্ধির হারের দিক থেকেও কিছুটা উন্নতি হয়েছে। সাময়িক হিসাব অনুযায়ী চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ, যেখানে চূড়ান্ত হিসাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা ছিল ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। গণ-অভ্যুত্থানের বছরে প্রবৃদ্ধি সর্বনিম্নে নামার পর এ অর্থবছরে তা আংশিকভাবে পুনরুদ্ধার হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
মাথাপিছু আয় তিন হাজার ডলারে পেরল
বিবিএসের তথ্য বলছে, দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৬৮ হাজার ৮৭৩ টাকা বা ৩ হাজার ২০ মার্কিন ডলার। আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই আয় ছিল ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৫১১ টাকা বা ২ হাজার ৭৬৯ ডলার। এক বছরে মাথাপিছু আয় বেড়েছে ৩৪ হাজার ৩৬২ টাকা। এর আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় ছিল ২ হাজার ৭৩৮ ডলার। তিন বছরের ধারায় এটি একটি ধারাবাহিক ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা।
কৃষি ও সেবায় আলো, শিল্পে অন্ধকার
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, অর্থনীতির চিত্রটি মিশ্র। কৃষি ও সেবা খাতে প্রবৃদ্ধি কিছুটা উন্নত হলেও শিল্প খাতে পতন উদ্বেগজনক। চলতি অর্থবছরে কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৭৮ শতাংশ, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ২ দশমিক ৪২ শতাংশের তুলনায় ০ দশমিক ৩৬ শতাংশ বেশি। তবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ৩ দশমিক ৩০ শতাংশের চেয়ে এখনো কম।
শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৮৬ শতাংশে, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ৩ দশমিক ৭১ শতাংশের তুলনায় ০ দশমিক ৮৫ শতাংশ কম। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এই হার ছিল ৩ দশমিক ৫১ শতাংশ। তিন বছরের ধারায় শিল্প খাতের ধারাবাহিক দুর্বলতা স্পষ্ট। সেবা খাতে প্রবৃদ্ধি কিছুটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৫৯ শতাংশে। আগের অর্থবছরে এটি ছিল ৪ দশমিক ৩৫ শতাংশ এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ৫ দশমিক ০৯ শতাংশ। জিডিপি প্রবৃদ্ধির বড় অংশ এখন সেবা খাতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
বিনিয়োগ-সঞ্চয়ের ক্রমাবনতি
অর্থনীতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো বিনিয়োগ ও সঞ্চয়ের ক্রমাগত পতন। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, জিডিপির সাথে মোট বিনিয়োগের অনুপাত কমে দাঁড়িয়েছে ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এটি ছিল ২৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ৩০ দশমিক ৭০ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র দুই বছরে বিনিয়োগ-জিডিপি অনুপাত কমেছে ২ দশমিক ৭৭ শতাংশীয় পয়েন্ট।
একই সাথে দেশজ সঞ্চয় কমে দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ৩৮ শতাংশে এবং জাতীয় সঞ্চয় কমে এসেছে ২৬ দশমিক ৯৩ শতাংশে। তুলনামূলকভাবে দেখলে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশজ সঞ্চয় ছিল ২১ দশমিক ৯৮ শতাংশ এবং জাতীয় সঞ্চয় ছিল ২৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ।
কেন কমছে বিনিয়োগ ও সঞ্চয়?
২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ টানা তৃতীয় বছরের মতো কমে গিয়ে জিডিপির ২২ দশমিক ০৩ শতাংশে নেমে এসেছে, যা গত ১১ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। সরকারি বিনিয়োগও এডিপি বাস্তবায়নে শ্লথগতির কারণে কমে গেছে। অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বিনিয়োগ পতনের পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছেন।
অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, বিনিয়োগ পরিবেশ দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল- বিশ্বব্যাংকের ব্যবসায়িক সহজতা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৯০টি দেশের মধ্যে ১৭৬তম। লাইসেন্স, নীতির অনিশ্চয়তা, জ্বালানি সরবরাহের অনিয়মিততা, জমির সঙ্কট এবং বাণিজ্য সহজীকরণে দুর্বলতা বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করছে। এ ছাড়া মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানিতে উল্লেখযোগ্য পতন ঘটেছে, যা নতুন শিল্পায়নে আগ্রহ কমে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
বিনিয়োগ ও সঞ্চয় হ্রাসের নেতিবাচক দিক
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিনিয়োগ কমার সরাসরি প্রভাব পড়ে কর্মসংস্থানে। প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন, কিন্তু বিনিয়োগ না বাড়লে তাদের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি সম্ভব হবে না। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো মুস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, বেসরকারি বিনিয়োগে তীব্র পতন কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উভয়ের জন্যই উদ্বেগজনক।
সঞ্চয় হ্রাসের অর্থ হলো, দেশের ভেতরেই বিনিয়োগের জন্য পুঁজি সংগ্রহের ক্ষমতা কমছে। ফলে বিনিয়োগের ঘাটতি পূরণে বাইরের উৎসের ওপর নির্ভরতা বাড়বে, যা মুদ্রার ওপর চাপ ফেলে এবং বৈদেশিক ঋণনির্ভরতা বাড়ার ঝুঁকি তৈরি করে। উল্লেখ্য, ডিসেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০৩ বিলিয়ন ডলারে।
কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে
তবে কিছু বিশ্লেষক বলছেন, বিনিয়োগ কমার সাথে সাথে যদি বিনিয়োগের মান ও উৎপাদনশীলতা বাড়ে, তাহলে প্রবৃদ্ধির গতি বজায় রাখা সম্ভব। এ অর্থবছরে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে, যদিও মোট বিনিয়োগ অনুপাত কমেছে। এর মানে, একই পরিমাণ বিনিয়োগে তুলনামূলক বেশি উৎপাদন হচ্ছে। পাশাপাশি মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কিছুটা বাড়ছে, যা ভোগ-ব্যয়চালিত প্রবৃদ্ধিকে সহায়তা করছে।
উন্নয়ন সহযোগীদের পূর্বাভাসের সাথে মিল
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) গত এপ্রিলে পূর্বাভাস দিয়েছিল, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশ হতে পারে। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস ছিল বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে এ অর্থবছর প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশে নামতে পারে। সেই তুলনায় বিবিএসের সাময়িক হিসাব ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ উভয় সংস্থার পূর্বাভাসের চেয়ে সামান্য ওপরে। এডিবি আরো জানিয়েছে, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৪ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কৃষি ও সেবা খাতের ইতিবাচক পারফরম্যান্সের কারণে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি কিছুটা বেড়েছে। তবে শিল্প খাতে ধারাবাহিক পতন এবং বিনিয়োগের দুর্বলতা দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাকে সঙ্কুচিত করছে। বিশেষজ্ঞ মত অনুযায়ী, বেসরকারি বিনিয়োগে ঘাটতি রয়েছে এবং শিগগিরই পরিস্থিতির উন্নতির আশু সম্ভাবনা নেই। বার্ষিক উন্নয়ন ব্যয়ও প্রত্যাশার চেয়ে কম।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি আসিফ ইব্রাহিম বলেছেন, বিনিয়োগ-জিডিপি অনুপাতের পতন এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের শ্লথগতি কর্মসংস্থানের জন্য মারাত্মক হুমকি। প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে আসছেন, বেসরকারি খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না হলে তারা কর্মহীন থাকবেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নয়নে দুর্নীতি দমন, অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য, ক্ষুদ্র ব্যবসার সুরক্ষা, কর প্রণোদনায় সংস্কার এবং ব্যবসায়িক পরিবেশ সহজতর করা এখন অগ্রাধিকারমূলক কাজ হওয়া উচিত।



