ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রধান সূতিকাগার। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ৫ আগস্ট পতন ঘটেছিল টানা দেড় দশক ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী সরকারের। এর আগে জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর নৃশংস হামলা চালিয়েছিল তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। শিক্ষার্থীদের ওপর অমানবিক নির্যাতন ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনে সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও তদন্ত সাপেক্ষে হামলায় জড়িত ১২৮ জন নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করে। দীর্ঘদিনের ত্রাস সৃষ্টিকারী এই সংগঠনটি নিষিদ্ধ হওয়ার পর সাধারণ শিক্ষার্থীরা ভেবেছিলেন, ক্যাম্পাসে হয়তো আর কখনো ছাত্রলীগের রাজত্ব ফিরে আসবে না।
কিন্তু সাম্প্রতিক চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। নিষিদ্ধ ঘোষিত এই সংগঠনটি আবারো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তৎপরতা শুরু করেছে। প্রথম দিকে আত্মগোপনে থাকলেও, ধীরে ধীরে তারা খোলস ছেড়ে বের হওয়ার চেষ্টা করছে। গভীর রাতে ঝটিকা মিছিল, ভোরে হলের গেটে ব্যানার টাঙানো কিংবা প্রকাশ্য দিবালোকে লিফলেট বিতরণের মতো ঘটনা ঘটছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের মনে এখন একটাই প্রশ্ন, ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কি পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে, নাকি নতুন প্রশাসনের শিথিলতার সুযোগ নিচ্ছে তারা?
প্রশাসন ও পুলিশের দায়সারা ভূমিকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাঠামোর রদবদলের সাথে ছাত্রলীগের এই পুনরুত্থানের গভীর যোগসূত্র খুঁজছেন ক্যাম্পাস বিশ্লেষকরা। ৫ আগস্টের পর ভিসির দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খান। তার মেয়াদে বহিরাগত প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ ও প্রক্টরিয়াল বডির তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। কিন্তু ২০২৬ সালের ১৬ মার্চ ভিসি হিসেবে নিয়োগ পান বিএনপিপন্থী শিক্ষক প্যানেলের (সাদা দল) নেতা অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। এর কিছুদিন পর, ১০ মে ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন তৎকালীন প্রক্টর সহযোগী অধ্যাপক সাইফুদ্দীন আহমেদ। তার স্থলাভিষিক্ত হন চারুকলা অনুষদের সহযোগী অধ্যাপক মো: ইসরাফিল প্রাং (ইসরাফিল রতন)। অভিযোগ উঠেছে, প্রশাসন ও প্রক্টরিয়াল টিমের এই রদবদলের পর থেকেই ক্যাম্পাসে নিষিদ্ধ সংগঠনের তৎপরতা হঠাৎ ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করেছে।
অনুসন্ধানের তথ্য বলছে, প্রশাসনের প্রথম ১৮ মাসে (৫ আগস্ট ২০২৪ থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) ছাত্রলীগের সশরীরে কর্মসূচির ঘটনা ঘটেছিল মাত্র ৪টি। এর মধ্যে ছিল ২৩ অক্টোবর ২০২৪ মধুর ক্যান্টিন এলাকায় ৮-১০ জনের ঝটিকা মিছিল এবং ১৬ জুন ২০২৫ বঙ্গবন্ধু হলের সামনে ককটেল বিস্ফোরণ।
অথবা, বর্তমান ভিসির আমলের মাত্র চার মাসে (১২ ফেব্রুয়ারি থেকে ৫ জুন ২০২৬) ক্যাম্পাসে সংগঠনটির অন্তত ৬টি কর্মসূচির প্রমাণ মিলেছে, যার ধরন আগের চেয়ে ভিন্ন। উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলো হলো : ২৭ ফেব্রুয়ারি মধুর ক্যান্টিন ও কার্জন হলের দেওয়ালে পোস্টার লাগানো; ২২ মার্চ ঈদুল ফিতরের সকালে দোয়েল চত্বর থেকে টিএসসি অভিমুখে ১৫ মিনিটের ঝটিকা মিছিল; ২ মে রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে ব্যানারসহ মিছিলের সময় ছাত্রলীগ নেতা ফারহান তানভীর ও এক মাইক্রোবাস চালককে আটক; ১ জুন বিকেল ৪টায় ডাকসু ভবনের সামনে প্রকাশ্য নীরব মানববন্ধন ও লিফলেট বিতরণ এবং ৫ জুন ভোর সাড়ে ৪টায় জহুরুল হক হলের মূল ফটকে শোক ব্যানার টাঙানো ও একই দিন সকালে হাইকোর্ট মোড়ে ঝটিকা মিছিল।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, দিনের আলোতে ডাকসু ভবনের সামনে কর্মসূচি পালন করা বা বারবার প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করা ছাত্রলীগের এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক বিজয় এবং বর্তমান প্রশাসনের ব্যর্থতারই ইঙ্গিত দেয়।
যেভাবে চলছে গোপন নেটওয়ার্ক
বিশ্ববিদ্যালয় ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র জানায়, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মূল কার্যক্রম চলছে অনলাইন ও অফলাইনের এক জটিল নেটওয়ার্কে। যোগাযোগের জন্য তারা ব্যবহার করছে ‘টেলিগ্রাম’ এবং ‘সিগন্যালে’র মতো এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপ্টেড অ্যাপ। মূলত ছাত্রলীগের সাবেক কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতার মাধ্যমে ঢাকা শহরের বিভিন্ন মেস বা ফ্ল্যাট বাড়ি থেকে এই কার্যক্রমে গোপনে অর্থায়ন করা হচ্ছে। তারা মূলত ‘হিট অ্যান্ড রান’ পদ্ধতি অনুসরণ করছে। মাত্র ১-২ মিনিটের জন্য ক্যাম্পাসে এসে ছবি বা ভিডিও ধারণ করে দ্রুত পালিয়ে যাচ্ছে এবং পরে সেগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে অস্তিত্ব প্রমাণের চেষ্টা করছে।
জাতীয় নির্বাচনের পর রাজনৈতিক পটভূমির ধীর পরিবর্তন এবং সম্প্রতি দেশের উচ্চ আদালত থেকে অনেক শীর্ষ আওয়ামী লীগ নেতার জামিন পাওয়ায় মাঠপর্যায়ের কর্মীরা নতুন করে সাহস সঞ্চয় করছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
নিরাপত্তায় বড় ফাটল : সিসিটিভি আছে, তদারকি নেই
বর্তমানে ক্যাম্পাসের প্রবেশ পথগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনেকটাই শিথিল। নীলক্ষেত, শাহবাগ বা কার্জন হলের প্রবেশমুখে সন্দেহভাজনদের আইডি কার্ড চেক করার কড়াকড়ি এখন আর নেই। সিসিটিভি ক্যামেরা সচল থাকলেও তা তাৎক্ষণিক মনিটরিং করার জন্য পর্যাপ্ত দক্ষ জনবলের চরম অভাব রয়েছে বলে প্রক্টর অফিসের সূত্র নিশ্চিত করেছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। প্রতিটি ঘটনার পরই শাহবাগ বা রমনা থানায় মামলা হলেও তদন্তের অগ্রগতি হতাশাজনক। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর ও সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা না থাকলে পুলিশের পক্ষে স্বপ্রণোদিত হয়ে ক্যাম্পাসের ভেতরে সার্বক্ষণিক অভিযান চালানো সম্ভব হয় না। আর এই প্রশাসনিক দুর্বলতা ও দ্রুত জামিন পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতির কারণেই গ্রেফতার হওয়া কর্মীরা আবারো সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।
সামনে কি বড় কোনো সঙ্ঘাতের ইঙ্গিত?
ক্যাম্পাসে নিষিদ্ধ সংগঠনের পুনঃপদচারণা সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে গভীর ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতার সঞ্চার করেছে। বিশেষ করে যারা জুলাই আন্দোলনে সরাসরি যুক্ত ছিলেন, তাদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক বিরাজ করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আবাসিক শিক্ষার্থীরা জানান, ‘আমরা রক্ত দিয়ে যে ক্যাম্পাস থেকে টর্চার সেল আর গেস্টরুম কালচার শেষ করেছি, সেখানে দিনেদুপুরে আবার মিছিল হচ্ছে। প্রশাসন কি আমাদের নিরাপত্তা দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ?’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কয়েকজন কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বর্তমান প্রশাসন অত্যন্ত ঢিলেঢালাভাবে ক্যাম্পাস চালাচ্ছে। একটি নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী সংগঠন ক্যাম্পাসে এসে লিফলেট বিতরণ করে নির্বিঘেœ চলে যায়, আর প্রশাসন বলে তারা টের পায় না! এটি আসলে তাদের ব্যর্থতা নাকি ফ্যাসিস্টদের পুনর্বাসনের চেষ্টা, তা নিয়ে ছাত্রসমাজের মনে সন্দেহ জাগছে।’
সাবেক প্রক্টর অধ্যাপক সাইফুদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘আমাদের সময় ক্যাম্পাসের নিরাপত্তার ব্যাপারে খুব কঠোর ছিলাম। বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে হয়তো জাতীয় নির্বাচন পরবর্তী একটি ধারণা কাজ করছে যে আওয়ামী লীগ কিংবা ছাত্রলীগের প্রতি কিছুটা উদারতা আছে।’
এ বিষয়ে বর্তমান প্রক্টর সহযোগী অধ্যাপক মো: ইসরাফিল প্রাং বলেন, ‘এক-দেড় মিনিটে যেকোনো প্রোগ্রাম করে জানান দিতে পারে বলে তারা মনে করে। তবে এটা কাউকে স্পেসিফিক কোনো স্পেস দেয়ার বিষয় নয়। আমরা প্রশাসনিকভাবে নাম-ঠিকানা সংগ্রহসহ সবকিছুর চেষ্টা করছি।’
শিক্ষাবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, প্রশাসন যদি এখনই কঠোর নজরদারি ও নি-িদ্র নিরাপত্তানীতি গ্রহণ না করে, তবে এসব ছোট ছোট ঝটিকা কর্মসূচি ভবিষ্যতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে বড় ধরনের অনাকাক্সিক্ষত সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটাতে পারে।



