একাধিক গাড়ির ওপর নতুন পরিবেশ সারচার্জ : ৫ বছরে কী পরিবর্তন আসছে

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭-এ সরকার পরিবেশ সুরক্ষা এবং বিলাসবহুল ভোগের ওপর কর-চাপ বাড়ানোর লক্ষ্যে মোটরগাড়ির ক্ষেত্রে নতুন করে পরিবেশ সারচার্জ আরোপ ও পুনর্নির্ধারণ করেছে। প্রস্তাবিত আইনে ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে ২০৩০-৩১ অর্থবছর পর্যন্ত পাঁচ বছরের জন্য একজন ব্যক্তির নামে একাধিক মোটরগাড়ি থাকলে দ্বিতীয় ও পরবর্তী প্রতিটি গাড়ির ওপর নির্দিষ্ট হারে পরিবেশ সারচার্জ দিতে হবে।

কর বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ব্যবস্থা একদিকে পরিবেশ দূষণ কমানোর বার্তা দেবে, অন্যদিকে উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের বিলাসী ভোগের ওপর অতিরিক্ত রাজস্ব আহরণের সুযোগ সৃষ্টি করবে।

কোন গাড়িতে কত সারচার্জ

নতুন বিধান অনুযায়ী একজন করদাতার নামে একাধিক মোটরগাড়ি থাকলে প্রথম বা সর্বনি¤œ হারে করযোগ্য গাড়ি বাদে অন্য প্রতিটি গাড়ির জন্য ইঞ্জিনক্ষমতা (সিসি) অনুযায়ী বার্ষিক পরিবেশ সারচার্জ নির্ধারণ করা হয়েছে।

গাড়ির ধরন - পরিবেশ সারচার্জ

১৫০০ সিসি পর্যন্ত - ২৫,০০০ টাকা

১৫০০ সিসির বেশি কিন্তু ২০০০ সিসি পর্যন্ত - ৫০,০০০ টাকা

২০০০ সিসির বেশি কিন্তু ২৫০০ সিসি পর্যন্ত - ৭৫,০০০ টাকা

২৫০০ সিসির বেশি কিন্তু ৩০০০ সিসি পর্যন্ত - ১,৫০,০০০ টাকা

৩০০০ সিসির বেশি কিন্তু ৩৫০০ সিসি পর্যন্ত - ২,০০,০০০ টাকা

৩৫০০ সিসির বেশি - ৩,৫০,০০০ টাকা

এ ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তির একাধিক গাড়ি থাকলে যে গাড়ির ওপর সর্বনি¤œ হারে সারচার্জ আরোপিত হবে, সেই গাড়িটি বাদে বাকি সব গাড়ির জন্য নির্ধারিত হারে সারচার্জ পরিশোধ করতে হবে।

নিবন্ধন ও ফিটনেস নবায়নের সময় আদায়

আইনে বলা হয়েছে, পরিবেশ সারচার্জ গাড়ির নিবন্ধন বা ফিটনেস নবায়নের সময় উৎসে সংগ্রহ করা হবে। অর্থাৎ বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ফিটনেস বা নিবন্ধন নবায়নের সময় এই অর্থ আদায় করবে।

তবে একাধিক বছরের জন্য নিবন্ধন বা ফিটনেস নবায়ন করা হলে সংশ্লিষ্ট অর্থবছরের ৩০ জুনের মধ্যে সারচার্জ পরিশোধ করতে হবে। নির্ধারিত সময়ে পরিশোধ না করলে পরে বকেয়া সারচার্জসহ অতিরিক্ত অর্থ দিতে হবে।

বকেয়া থাকলে কী হবে

কোনো করদাতা নির্ধারিত সময়ে পরিবেশ সারচার্জ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে পরবর্তী সময়ে নিবন্ধন বা ফিটনেস নবায়নের সময় পূর্ববর্তী বছরের বকেয়া সারচার্জ এবং চলতি বছরের সারচার্জ একত্রে আদায় করা হবে।

এছাড়া আয়কর রিটার্ন দাখিলের আগে সারচার্জ পরিশোধ না করা হলে উপকর কমিশনার কর নির্ধারণ বা রিটার্ন প্রসেসিংয়ের সময় তা আদায়ের ক্ষমতা রাখবেন। ফলে সারচার্জ এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ কার্যত সীমিত হয়ে যাচ্ছে।

কোন যানবাহন এর আওতার বাইরে

সব ধরনের মোটরযান এই সারচার্জের আওতায় আসছে না। আইনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, নি¤েœাক্ত যানবাহনগুলো পরিবেশ সারচার্জের সংজ্ঞার বাইরে থাকবে- বাস, মিনিবাস, কোস্টার, প্রাইম মুভার, ট্রাক, লরি, ট্যাংক লরি, পিকআপ ভ্যান, হিউম্যান হলার, অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল।

অর্থাৎ মূলত ব্যক্তিগত ব্যবহারের প্রাইভেট কার ও জিপ জাতীয় যানবাহনের ক্ষেত্রেই এ বিধান কার্যকর হবে।

প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের কর্মসংস্থানে কর রেয়াত

বাজেটের চতুর্থ অংশে সামাজিক অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসংস্থান উৎসাহিত করতে নতুন কর রেয়াত সুবিধাও রাখা হয়েছে।

কোনো প্রতিষ্ঠান তাদের মোট কর্মীর অন্তত ১০ শতাংশ অথবা ২৫ জনের বেশি কর্মী প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মধ্য থেকে নিয়োগ করলে তারা দুই ধরনের হিসাবের মধ্যে যেটি কম হবে, সেই পরিমাণ কর রেয়াত পাবে- প্রদেয় করের ৫ শতাংশ, অথবা প্রতিবন্ধী কর্মীদের প্রদত্ত মোট বেতনের ৭৫ শতাংশ।

একই ধরনের সুবিধা দেয়া হয়েছে তৃতীয় লিঙ্গের কর্মীদের নিয়োগের ক্ষেত্রেও। কোনো প্রতিষ্ঠান যদি মোট কর্মীর কমপক্ষে ১০ শতাংশ অথবা ২৫ জনের বেশি তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তি নিয়োগ করে, তাহলে একই হারে কর রেয়াত পাবে।

সামাজিক ও পরিবেশগত বার্তা

বিশ্লেষকদের মতে, পরিবেশ সারচার্জ আরোপের মাধ্যমে সরকার একদিকে অধিক সংখ্যক ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করতে চাচ্ছে, অন্যদিকে পরিবেশগত ক্ষতির একটি অর্থনৈতিক মূল্য নির্ধারণের চেষ্টা করছে। একই সাথে প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান বাড়াতে কর প্রণোদনা যুক্ত করে সামাজিক অন্তর্ভুক্তির বার্তাও দেয়া হয়েছে।

ফলে বাজেট ২০২৬-২৭-এর এই দু’টি পদক্ষেপকে পরিবেশ সংরক্ষণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গঠনের দ্বিমুখী নীতিগত উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এর বাস্তব প্রভাব কতটা হবে, তা নির্ভর করবে বাস্তবায়ন, নজরদারি এবং কর প্রশাসনের সক্ষমতার ওপর।