শুল্ক আইনে নতুন যুগ : দেশে চালু হচ্ছে ‘মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল’ ব্যবস্থা

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

বাংলাদেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে সরকার শুল্ক আইন, ২০২৩-এ নতুন একটি অধ্যায় সংযোজনের উদ্যোগ নিয়েছে। এই অধ্যায়ে প্রথমবারের মতো দেশে মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠার আইনি ভিত্তি তৈরি করা হয়েছে। সংশোধনীটি কার্যকর হলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) দেশের যেকোনো এলাকাকে গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করতে পারবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ আঞ্চলিক বাণিজ্য ও লজিস্টিকস হাব হিসেবে নতুন সুযোগ পাবে। তবে একই সাথে শুল্কফাঁকি, মানিলন্ডারিং এবং অবৈধ পণ্য পাচারের ঝুঁকি মোকাবেলায় শক্তিশালী নজরদারি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

কী হচ্ছে মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলে : নতুন বিধান অনুযায়ী, এফটিজেড-এ অবস্থিত প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানি ও রফতানি করতে পারবে। এ জন্য প্রচলিত বন্ডেড ওয়্যারহাউজ লাইসেন্সের প্রয়োজন হবে না।

শুধু আমদানি-রফতানিই নয়, এসব অঞ্চলে পণ্য সংরক্ষণ, গ্রেডিং, রিপ্যাকিং, রিলেবেলিং, বাল্ক ব্রেকিং, উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ, আন্তর্জাতিক ট্রেডিং ইত্যাদি কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে। এতে বাংলাদেশের বিদ্যমান রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্কগুলোর পাশাপাশি একটি নতুন বাণিজ্যিক অবকাঠামো গড়ে উঠবে।

দেশীয় বাজারে বিক্রির সুযোগ, তবে শুল্ক দিয়ে : সংশোধনীতে বলা হয়েছে, এফটিজেড থেকে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে কোনো পণ্য সরবরাহ করা হলে আমদানিপণ্যের মতোই সবধরনের প্রযোজ্য শুল্ক ও কর পরিশোধ করতে হবে। অর্থাৎ, অঞ্চলটিকে কার্যত দেশের বাইরে অবস্থিত একটি কাস্টমস টেরিটরি হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য উৎপাদিত পণ্যের ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত সুবিধা থাকলেও দেশীয় বাজারে প্রবেশের সময় রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

৪৮ মাস পর্যন্ত পণ্য সংরক্ষণের সুযোগ : আইনের নতুন বিধান অনুযায়ী এফটিজেডে আমদানি করা পণ্য সর্বোচ্চ ৪৮ মাস পর্যন্ত শুল্ক ছাড়াই সংরক্ষণ করা যাবে। বিশেষ পরিস্থিতিতে কমিশনার অব কাস্টমস আরো ১২ মাস সময় বাড়াতে পারবেন। এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ সুবিধা আন্তর্জাতিক লজিস্টিকস, ট্রান্সশিপমেন্ট ও আঞ্চলিক বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে বাংলাদেশের সম্ভাবনাকে বাড়াবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বেসরকারি অপারেটরও লাইসেন্স পাবে : সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও ঋঞত অপারেটর হিসেবে লাইসেন্স পাবে।

একই সাথে লজিস্টিকস সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান, কাস্টমস এজেন্ট এবং অন্যান্য সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্ট লাইসেন্স ও কাস্টমস অনুমোদনের আওতায় আনা হয়েছে। ফলে পুরো কার্যক্রমকে একটি নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।

কাস্টমসের নজরদারি আরো জোরদার : নতুন অধ্যায়ে কাস্টমস কর্মকর্তাদের ব্যাপক ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। তারা এফটিজেডের যেকোনো স্থাপনায় প্রবেশ করতে পারবেন; পণ্য, হিসাবপত্র ও ইলেকট্রনিক রেকর্ড পরীক্ষা করতে পারবেন; প্রয়োজন হলে নথি জব্দ করতে পারবেন; যানবাহন তল্লাশি করতে পারবেন; প্যাকেজ খুলে পরীক্ষা করতে পারবেন। এ ছাড়া শুল্কফাঁকি, চোরাচালান, মানিলন্ডারিং ও মাদক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও কাস্টমস কর্মকর্তাদের বিশেষ ক্ষমতা বহাল রাখা হয়েছে।

রিটেইল ব্যবসায় সীমিত অনুমতি : এফটিজেডে খুচরা বিক্রয় সাধারণভাবে অনুমোদিত হবে না। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বিশেষ অনুমোদন ছাড়া কোনো রিটেইল ব্যবসা পরিচালনা করা যাবে না। এ বিধান মূলত অঞ্চলগুলোকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখার উদ্দেশ্যে রাখা হয়েছে।

শুল্ক আইনেও কঠোরতা বাড়ছে : মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল চালুর পাশাপাশি শুল্ক আইন, ২০২৩-এর বিভিন্ন ধারায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও সংশোধন করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- নির্ধারিত সময়ে পণ্য ঘোষণা না দিলে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা; কাস্টমস এলাকা থেকে অবৈধভাবে পণ্য সরালে পণ্য বাজেয়াপ্তের বিধান; শুল্ক ও করফাঁকির ক্ষেত্রে অধিক জরিমানা; আদায়যোগ্য অর্থ ব্যাংক হিসাব বা তৃতীয় পক্ষের কাছ থেকে আদায়ের ক্ষমতা।

এ ছাড়া হাইকোর্ট বিভাগে আপিলের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ জমা দেয়ার বিধান সংযোজন করা হয়েছে।

বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের নতুন দিগন্ত : বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এফটিজেড ব্যবস্থার মাধ্যমে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, পুনঃরফতানি বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশে এ ব্যবস্থা কার্যকর হলে বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়তে পারে; বন্দরভিত্তিক লজিস্টিকস-শিল্প সম্প্রসারিত হতে পারে; আন্তর্জাতিক ট্রেডিং কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করা সম্ভব হতে পারে; রফতানি বহুমুখীকরণে সহায়তা মিলতে পারে।

তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, সফল বাস্তবায়নের জন্য কাস্টমস অটোমেশন, ডিজিটাল ট্র্যাকিং, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং স্বচ্ছ নজরদারি ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে। অন্যথায় শুল্কমুক্ত সুবিধার অপব্যবহার এবং রাজস্ব ক্ষতির আশঙ্কা থেকেই যাবে।

শুল্ক আইনে ‘মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল’ সংযোজন বাংলাদেশের বাণিজ্যনীতিতে একটি কাঠামোগত পরিবর্তনের সূচনা করতে যাচ্ছে। এটি এক দিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে, অন্য দিকে কাস্টমস প্রশাসনের ওপর আরো বড় দায়িত্বও আরোপ করবে। ফলে এই উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে কতটা কার্যকরভাবে শুল্ক সুবিধা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা যায় তার ওপর।