হিট ডোম ও চরম তাপদাহ

তীব্র তাপে জ্বলছে যুক্তরাষ্ট্র, রক্ষায় শহরগুলোর উদ্ভাবনী লড়াই

নয়া দিগন্ত ডিজিটাল

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে বিশ্বজুড়ে একের পর এক ভেঙে পড়ছে তাপমাত্রার রেকর্ড। যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চল জুড়ে তৈরি হওয়া নতুন ‘হিট ডোম’ বা তীব্র তাপবলয়ের কারণে তাপমাত্রা পৌঁছেছে ১০৬ ডিগ্রি ফারেনহাইটে (প্রায় ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াস)। চরম এই তাপদাহে কেবল জনজীবনই স্থবির হয়ে পড়েনি, বরং আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে তাপদাহজনিত জরুরি স্বাস্থ্যঝুঁকি। তবে তীব্র তাপের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মার্কিন শহরগুলো গ্রহণ করছে নানামুখী পরিবেশবান্ধব ও প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবনী পদক্ষেপ।

​গবেষণায় দেখা গেছে, ঘনবসতিপূর্ণ শহরাঞ্চলের কালো পিচের রাস্তা এবং বিশাল দালানকোঠা দিনের বেলা সূর্যতাপ শুষে নেয় ও রাতে তা পরিবেশে ছড়িয়ে দেয়। একে বলা হয় ‘আর্বান হিট আইল্যান্ড’ প্রভাব। এর ফলে শহরের তাপমাত্রা পাশের গ্রামীণ এলাকার চেয়ে প্রায় ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেশি হতে পারে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বয়স্ক ব্যক্তি, শিশু ও নিম্নআয়ের বাসিন্দারা।

​এই চরম বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে লস অ্যাঞ্জেলেস, সান ফ্রান্সিসকো এবং নিউ ইয়র্কের মতো বড় শহরগুলো বাধ্যতামূলক করেছে ‘কুল রুফ’ নীতি। ভবনের ছাদে এবং রাস্তার উপরিভাগে সাদা রঙ ও বিশেষ তাপ-প্রতিফলক কোটিং দেওয়া হচ্ছে। একটি সাধারণ সাদা ছাদ সূর্যের প্রায় ৮০ শতাংশ আলো প্রতিফলিত করতে পারে, যা ভবনের ভেতরের তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমায়।

​প্রাকৃতিক উপায়ে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে অন্যতম প্রধান হাতিয়ার করা হয়েছে নগর সবুজায়নকে। ফিনিক্স ও অস্টিনের মতো উত্তপ্ত শহরগুলো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শহরের ৫০ শতাংশ এলাকা বৃক্ষচ্ছায়ায় ঢেকে ফেলার বৃহৎ লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে। বড় বড় গাড়ির পার্কিং লট কমিয়ে সেখানে রোপণ করা হচ্ছে হাজার হাজার গাছ। অন্যদিকে, সান ফ্রান্সিসকো নতুন ভবনগুলোর ছাদে গাছপালা লাগিয়ে ‘গ্রিন রুফ’ তৈরি করা বাধ্যতামূলক করেছে।

​তাপদাহের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নাসা (NASA) এবং প্রযুক্তির সহায়তায় নাগরিকদের যুক্ত করা হচ্ছে ডাটা সংগ্রহের কাজে। লাস ভেগাস ও অ্যালবুকার্কিতে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীরা থার্মাল সেন্সর দিয়ে শহরের প্রতিটি এলাকার তাপমাত্রা রেকর্ড করে তৈরি করছেন ‘হিট ম্যাপ’। এর মাধ্যমে মূলত অতি-ঝুঁকিপূর্ণ নিম্নআয়ের এলাকাগুলো চিহ্নিত করা হচ্ছে এবং সেখানে দ্রুত কুলিং সেন্টার স্থাপন ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী সহায়তা পৌঁছানো হচ্ছে।

​যদিও রাস্তার সাদা রঙ স্থায়ী না হওয়া বা বাতাসে আর্দ্রতা বৃদ্ধির মতো কিছু প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তবুও হাত গুটিয়ে বসে থাকার সুযোগ নেই। নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, একক কোনো উপায়ে তাপ কমানো সম্ভব নয়; বরং গাছ লাগানো, সাদা রঙ দেওয়া এবং প্রযুক্তিভিত্তিক নগর পরিকল্পনার যৌথ প্রচেষ্টাতেই ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে শহরগুলোকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে।

লেখক: নয়া দিগন্তের ইন্টার্ন শিক্ষার্থী।