আলোচনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি

পুলিশে চাই পেশাদারিত্ব

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশের চেইন অব কমান্ড ঠিক করা জরুরি। সেই সাথে তাদের মনোবল বাড়াতে হবে। তাদের স্বাধীনভাবে আইন প্রয়োগের মতো পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত। অপরাধীরা কার ছত্রছায়ায় মাঠে নামছে, তা চিহ্নিত করে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। সামাজিক মাধ্যমে অপরাধের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে জনমনে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি রোধে সাইবার নজরদারি বাড়াতে হবে।

শেখ হাসিনা রেজিম পুলিশকে যেভাবে ব্যবহার করেছিল তাতে পুলিশ বাহিনী হয়ে উঠেছিল জনগণের জন্য মহা আতঙ্ক। রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সরাসরি গুলি চালাত এই বাহিনীর সদস্যরা। ঘর থেকে তুলে নিয়ে গুম করা হতো মানুষকে। অনেকের কখনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। জুলাই বিপ্লবের পর আত্মগোপনে চলে যান এসব অপকর্মে জড়িত পুলিশ সদস্যদের অনেকে। অন্তর্বর্তী সরকার এসে পুলিশ বাহিনীতে সংস্কার করে। বিএনপি সরকার গঠন করার পর পরিবর্তন আসে আরেক দফা। কিন্তু এখনো প্রকৃত অর্থে পেশাদারিত্ব ফেরেনি পুলিশ বাহিনীতে।

এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সহযোগী একটি দৈনিক। এতে পুলিশ সদর দফতরের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, গত ছয় মাসে সারা দেশে পুলিশের ওপর ২৮৩টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। বাধ্যতামূলক অবসরের আতঙ্ক এবং অভ্যন্তরীণ গ্রুপিংয়ে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের মধ্যে তৈরি হয়েছে ‘গাছাড়া ভাব’। এর ফলে প্রায় প্রতিদিনই প্রকাশ্যে ছিনতাই, খুন ও চাঁদাবাজির ঘটনা প্রায় অবাধে ঘটছে। গত রোববার বিকেলে রাজধানীর মতিঝিলে জনতা ব্যাংকের করপোরেট শাখার সামনে প্রকাশ্যে গুলি করে এক ব্যবসায়ীর ১৭ লাখ টাকা ছিনতাই হয়েছে। আদাবর, বসিলাসহ পুরো মোহাম্মদপুর এলাকা অপরাধীদের স্বর্গরাজ্য। কিশোর গ্যাংয়ের হাতে জিম্মি সাধারণ মানুষ।

রোববার ট্র্যান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবির বরাতে গণমাধ্যমে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। এতে বলা হয়, বর্তমান সরকারের প্রথম ১০০ দিনে দেশে ৬০৫টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। ধর্ষণ ও সঙ্ঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২০৯ নারী ও শিশু। টিআইবির বরাতে গণমাধ্যমে শিরোনাম করা হয়, ‘সরকারের ১০০ দিনে খুন, অপহরণ বেড়েছে’। অথচ সংস্থাটির প্রতিবেদনে কোনো তুলনামূলক পরিসংখ্যান দেয়া হয়নি। অতীতের কোনো সময়ের সাথে তুলনাও করা হয়নি। এই অসঙ্গতি তুলে ধরেছে ফ্যাক্ট চেক প্রতিষ্ঠান দ্য ডিসেন্ট।

আমরা মনে করি, গণমাধ্যমের আরো সতর্ক ও দায়িত্বশীল হওয়া উচিত, যাতে কোনো গবেষণা বা বিবৃতির ভুল ব্যাখ্যা হাজির করা না হয়। পাশাপাশি, টিআইবির মতো সংগঠনের নিরপেক্ষতা ও ধারাবাহিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলার অবকাশ আছে। আওয়ামী রেজিমের চার মেয়াদের ১০০ দিনে তারা কেন এমন মূল্যায়ন করেনি, এমন প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারেনি সংস্থাটি। সরকারের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন অবশ্যই প্রশংসনীয়, তবে তা কোনো বিশেষ রাজনৈতিক অবস্থান থেকে যেন না হয়। এক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা জরুরি। সংবাদ পরিবেশনে ‘ক্লিকবেইট’ বা চাঞ্চল্য তৈরির মোহ ত্যাগ করে বস্তুনিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে হবে। ভুল সংবাদ পুরো সমাজে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশের চেইন অব কমান্ড ঠিক করা জরুরি। সেই সাথে তাদের মনোবল বাড়াতে হবে। তাদের স্বাধীনভাবে আইন প্রয়োগের মতো পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত। অপরাধীরা কার ছত্রছায়ায় মাঠে নামছে, তা চিহ্নিত করে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। সামাজিক মাধ্যমে অপরাধের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে জনমনে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি রোধে সাইবার নজরদারি বাড়াতে হবে।

আইনশৃঙ্খলার উন্নয়ন সরকারের একার দায়িত্ব নয়। পুলিশকে সাহসের সাথে দায়িত্ব পালন করতে হবে।