স্থবির নাগরিক সেবা ও উন্নয়ন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন কবে

স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গত মার্চ মাসে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য তিন মাস সময় নেয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু এখন চলতি বছরেও নির্বাচন শুরু হবে কি না তা নিয়েই সংশয় সৃষ্টি হয়েছে।

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে হাসিনার পতন ও পালানোর সাথে সাথে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও পতন ঘটে এবং তারা পালিয়ে যান। অন্তর্বর্তী সরকার কিছু প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগ করলে তখনই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দাবি ওঠে। এ নিয়ে সে সময় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-বিবিএসের এক জরিপে বলা হয়, ৬৪ দশমিক ৯৭ শতাংশ মানুষ জাতীয় নির্বাচনের আগেই স্থানীয় নির্বাচন চায়। বিএনপি তখন জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন করতে রাজি ছিল না। তাই স্থানীয় সরকার নির্বাচন করা সম্ভব হয়নি। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর প্রশাসক নিয়োগের ধারা অব্যাহত রাখে। এমতাবস্থায় প্রায় দুই বছর ধরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় নাগরিক সেবা ও উন্নয়ন স্থবির হয়ে আছে।

গত মঙ্গলবার নয়া দিগন্তে এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় গ্রামীণ ও শহুরে রাস্তা সংস্কারের কাজ এখন থমকে গেছে। এডিস মশার বিস্তার শহর ছাড়িয়ে এখন গ্রামপর্যায়ে ছড়িয়ে পড়েছে, ফলে গ্রামাঞ্চলেও ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ বাড়ছে। বর্ষা মৌসুমে ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে। গ্রামপর্যায়ে ছোটখাটো বিরোধ বা অপরাধের প্রথম পর্ব মীমাংসা হতো চেয়ারম্যান-মেম্বারদের মাধ্যমে। অন্যদিকে, শহরের আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা নিয়ন্ত্রণে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও পৌরমেয়রদের ভূমিকা থাকে। নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় স্থানীয় পর্যায়ে অপরাধের প্রবণতা ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।

আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী বাজেট প্রণয়ন, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে গ্রামীণ রাস্তা, কালভার্ট ও সেচব্যবস্থার ওপর। নির্বাচিতদের অনুপস্থিতিতে বরাদ্দকৃত সরকারি অনুদান ব্যবহারের ক্ষেত্রে তীব্র সমন্বয়হীনতা দেখা দিয়েছে। গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ওপর যে সামাজিক চাপ থাকে, তা আমলা বা দলীয় প্রশাসকদের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।

বিএনপি সবসময় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার পক্ষে কথা বলেছে। বিএনপি যে ‘রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের ৩১ দফা’ প্রকাশ করে তার ২১ নং দফায় বলা হয়েছে— ‘ক্ষমতার ব্যাপক বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে অধিকতর স্বাধীন, শক্তিশালী ও ক্ষমতাবান করা হইবে। ... স্থানীয় প্রশাসন ও অন্য কোনো জনপ্রতিনিধির খবরদারিমুক্ত স্বাধীন স্থানীয় সরকার নিশ্চিত করা হইবে। মৃত্যুজনিত কারণ কিংবা আদালতের আদেশে পদ শূন্য না হইলে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে সরকারি প্রশাসক নিয়োগ করা হইবে না।’

স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগ কিংবা নির্বাচন দিতে দেরি করাটা বিএনপির অঙ্গীকারের সাথে সাংঘর্ষিক!

স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গত মার্চ মাসে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য তিন মাস সময় নেয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু এখন চলতি বছরেও নির্বাচন শুরু হবে কি না তা নিয়েই সংশয় সৃষ্টি হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের বসানো প্রশাসকদের সরিয়ে নির্বাচন না দিয়ে বিএনপি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে, তাদের মাধ্যমে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল হলেও সেভাবে জনসেবা হচ্ছে না। দীর্ঘমেয়াদে তা জনগণের মধ্যে এক ধরনের ক্ষোভের সৃষ্টি করছে। তাই যত দ্রুত সম্ভব স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করাই হবে জন-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন।