জাতীয় নির্বাচনে ভোটের সমীকরণ

এবার তরুণদের ভোট রয়েছে প্রায় চার কোটি অর্থাৎ প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। তাদের ভোটও এবার সিদ্ধান্তমূলক হবে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শিক্ষার্থী ও তরুণদের ব্যাপক অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, তারা আওয়ামী ফ্যাসিবাদের প্রত্যাবর্তন চান না এবং ভারতের আধিপত্যও তারা মেনে নেবেন না। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অনেক দল, গোষ্ঠী ও ব্যক্তি-পরিবার সম্পৃক্ত থাকলেও সম্মুখ সারির পরিচিত যোদ্ধারা এনসিপি নামক রাজনৈতিক দল গঠন করেছেন। একই সাথে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটে যোগ দিয়ে নির্বাচন করছেন। ফলে তরুণদের একটি বড় অংশের ভোট তারা পাবেন বলে ধারণা করা যেতে পারে

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারিতে (২০২৬) অনুষ্ঠেয় নির্বাচনের আর মাত্র চার দিন বাকি। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী সব রাজনৈতিক দল পুরোদমে তৃণমূলে ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে ধরনা দিচ্ছে। অনেক দেশের মতো বাংলাদেশের নির্বাচনেও প্রধান দুই-তিনটি দল সবসময়ে মূল প্রতিযোগিতায় আবির্ভূত হয়। সাম্প্রতিক অতীতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি প্রধানত প্রতিযোগিতায় থাকত। তবে ১৯৯১ সালের নির্বাচন থেকে জোটের রাজনীতি বিকশিত হয়। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত চার দলীয় জোট করে আওয়ামী লীগের বিপরীতে নির্বাচনে জিতে যায়। তখন ভোটের সমীকরণে জামায়াত তৃতীয় বা চতুর্থ শক্তি হলে দলটি বিএনপির সাথে জোটভুক্ত হওয়ায় ওই জোটের ভোটের সংখ্যা অন্তত ১০ ভাগ বেড়ে যায়। সেই সাথে নির্বাচনে জয়লাভ সহজ হয়ে যায়। এর সাথে যুক্ত হয়েছিল ইসলামপন্থী বিভিন্ন ধর্মীয় পক্ষের ভোটব্যাংক। আওয়ামী লীগ সাধারণভাবে কখনো ইসলামপন্থীদের ভোট তেমন একটা পায়নি। প্রেসিডেন্ট জিয়া ও বেগম খালেদা জিয়া বিএনপির রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসকে তুলে ধরতেন এবং এর ফলে দলটি সহজে ইসলামপন্থীদের ভোট পেত। আওয়ামী লীগ এ দিক থেকে সবসময় পিছিয়ে ছিল। তবে বহুবার ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করে নির্বাচনে জয়লাভ করার কৌশল অবলম্বন করেছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ছিল সে কৌশলের প্রধান প্রতিবন্ধক। সে কারণে ২০১০ সালে আদালতের যোগসাজশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে দেয়। আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় প্রতিবন্ধকতা ছিল জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য ইসলামী ঘরানার ভোটগুলো, যাতে বিএনপি না পায়। সে জন্য জামায়াতকে বিএনপি জোট থেকে বিচ্ছিন্ন করা। এ জন্য জামায়াতের ওপর আওয়ামী লীগ সরকার সীমাহীন চাপ সৃষ্টি করে। বিষয়টি শুধু দেশীয় রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। আন্তর্জাতিক বিশেষ করে প্রতিবেশী ভারতের সাথে সম্মিলিতভাবে প্রকল্প নেয়া হয়, যাতে জামায়াত তথা ইসলামী শক্তি বাংলাদেশে বিকশিত হতে না পারে। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় যাওয়ার পথে কোনো দিন বাধা হতে না পারে। এর অংশ হিসেবে ১৯৭১ সালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের নামে প্রহসনের বিচার করে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের হত্যা করা হয়। সর্বশেষে ২০২৪ সালে যখন আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকারের বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে, তখন তড়িঘড়ি করে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ করা হয়। এত কিছুর পরও জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য ইসলামপন্থী গণ-আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে এবং শেখ হাসিনার পতন ত্বরান্বিত করে। মজার বিষয় হলো, যে বিএনপির সাথে থাকায় জামায়াতকে এত ত্যাগ ও নির্যাতন সইতে হলো, সেই বিএনপি ও জামায়াত এখন পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ক্ষমতার জন্য লড়াই করছে। রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই।

এবারের আরেকটি লক্ষণীয় দিক হলো, যেহেতু আওয়ামী লীগ ও তার জোটসঙ্গীরা ভোটের মাঠে নেই। কিন্তু এদের একটি বিরাট ভোটব্যাংক রয়েছে। এবার কোনদিকে যাবে এই ভোটাররা। আওয়ামী লীগের উচ্ছিষ্টভোগী জাতীয় পার্টি কোনো দিন নিজস্ব স্বকীয়তা নিয়ে রাজনীতি করতে পারেনি। সর্বদাই ভারতের তাঁবেদারি ও আওয়ামী লীগের নতজানু হয়ে রাজনীতি করেছে। আওয়ামী লীগের পতনের সাথে সাথে তারাও এখন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার শেষ চেষ্টা করছে। দলটি নিষিদ্ধ করা না হলেও এখন রাজনীতির ফোকাসে নেই। ফলে আওয়ামী লীগের সুহৃদ হলেও আওয়ামী ভোটাররা তাদের ওপর আস্থা রাখতে পারছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে না।

তাহলে কি আওয়ামী সমর্থক ভোটাররা বিএনপির দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে? এটা একটি বড় প্রশ্ন এবং এর মধ্য দিয়ে ভোটের সমীকরণে বিরাট প্রভাব ফেলতে পারে। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিএনপি তাদের ভোটগুলো নিজ বাক্সে নিয়ে আসার চেষ্টা করছে। এ জন্য তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ধর্মীয় মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ইত্যাদি নিয়ে কথা বলে নিজেদের সেক্যুলার প্রমাণের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে; এমনকি তারা একসময় যে ডানপন্থার দিকে ঝুঁকেছিল; তা থেকে সরে এসে এখন বামপন্থার প্রতি ঝুঁকে পড়েছে। তারা একসময়ে ভারতবিরোধী মনোভাব দেখাতো; কিন্তু এখন ভারতের ব্যাপারে নীরবতা পালন করছে। রাজনীতির মাঠে একটি বিতর্ক রয়েছে, তারেক রহমান ভারতের সাথে বোঝাপড়া করে দেশে এসে ভোটের মাঠে অবতীর্ণ হয়েছেন। তিনি ভারতের প্রেসক্রিপশনে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনে সহায়তা করবেন, এমন ধারণা যদি সত্যি হয়ে থাকে; তাহলে আওয়ামী ভোটাররা বিএনপিকে ভোট দেবে এটা স্বাভাবিক বলে ধরে নিতে হবে। বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতের চেয়ে আওয়ামী লীগকে বেশি পছন্দ করে। কারণ আওয়ামী লীগকে মোকাবেলা করা তাদের জন্য সহজতর। একটু লক্ষ করলে দেখা যাবে, দেশে এখন জনগণের মধ্যে আওয়ামী লীগ ও ভারতের আধিপত্যবিরোধী একটা জনমত রয়েছে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে এটি বেশ প্রবল। তরুণরা এবারে ভোটে বড় প্রভাবশালী শক্তি। কিন্তু বিএনপি নেতা তারেক রহমান বা অন্য নেতারা ভারত বা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তেমন কথা বলছেন না। বরং তারা সুস্পষ্টভাবে বলছেন যে, তারা কোনো দল নিষিদ্ধ হোক তা চান না। তৃণমূলের বিএনপি নেতারা আওয়ামী লীগকে ফিরিয়ে আনার ইঙ্গিত দিচ্ছেন। এতে করে আওয়ামী লীগের সমর্থকরা বিএনপির ওপর সত্যিকার অর্থে আস্থা রাখতে পারছে কি না তাই দেখার বিষয়।

একটি জরিপে দেখানো হয়েছে, আওয়ামী সমর্থক ভোটারদের ৪৮ শতাংশ বিএনপিকে, প্রায় ৩০ শতাংশ জামায়াতকে এবং ১৭ শতাংশ এনসিপিকে ভোট দেবে। এ জরিপের ফাইন্ডিংস অনেকটা বাস্তবসম্মত বলে মনে করা যায়। কারণ নির্বাচনে দলীয় রাজনীতি ছাড়াও ব্যক্তিগত স্বার্থ, আঞ্চলিক আবেগ, আত্মীয়তার সম্পর্ক, আর্থিক স্বার্থ ইত্যাদি কাজ করে থাকে। ২০২৪ সালে ৫ আগস্টের পরে আওয়ামী লীগের যেসব নেতাকর্মী বিএনপি বা জামায়াত দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তারা সেটি ভুলবে না। আবার যারা বিএনপি বা জামায়াত নেতাকর্মীদের সহায়তায় আশ্রয় বা সহযোগিতা পেয়েছে; তাও তারা বিবেচনায় নেবে। বাংলাদেশের সীমিত ভৌগোলিক সীমানায় আওয়ামী লীগ-বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীদের মধ্যে আত্মীয়তা রয়েছে। সুতরাং সবকিছু দলীয় রাজনীতির কাঠামোতে বিবেচিত হয় না। এ বিবেচনায় মনে হয়, আওয়ামী সমর্থকদের ভোট বিএনপি বেশি পেলেও জামায়াত-এনসিপিও পাবে বলে মনে করা যায়। আবার এটা যেমন মনে করা সমীচীন হবে না যে, আওয়ামী লীগের সবাই দলের প্রতি অন্ধ। বরং এমন অনেকে আছে, তারা নিজস্ব বিবেচনায় স্বাধীনভাবে ভোট দেয়ার সিদ্ধান্ত নেবে। আরো একটি সম্ভাবনা রয়েছে, যারা উগ্রভাবে আওয়ামী সেক্যুলার রাজনীতির প্রতি আপসহীন, তারা হয়তো ভোটকেন্দ্রে আদৌ যাবে না। এদের সংখ্যা খুব বেশি হবে বলে মনে হয় না।

বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটারদের নিশ্চিতভাবে আওয়ামী লীগ বা বামপন্থীদের সমর্থক হিসেবে মনে করা হয়। যদিও তা সর্বাংশে ঠিক নয়। অতীতে দেখা গেছে, মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী এবং খুলনা, সাতক্ষীরার কয়েকজন জামায়াত প্রার্থী হিন্দুদের প্রচুর ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। পিরোজপুরের সুখরঞ্জন বালী নির্যাতন ও কারাভোগ করে প্রমাণ দিয়েছেন, তার সম্প্রদায়ের মধ্যে সত্যের পক্ষে থাকার মতো লোক রয়েছে। সুতরাং এবারে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে হিন্দু ভোটাররা সবাই বিএনপিকে ভোট দেবে বলে মনে হয় না। এবার জামায়াত একজন হিন্দু প্রার্থী দিয়েছে। ফলে জামায়াতকে সাম্প্রদায়িক বা হিন্দুবিদ্বেষী বলে আখ্যায়িত করার সুযোগ নেই। সোস্যাল মিডিয়া থেকে প্রতীয়মান হয় যে, এবার জামায়াত হিন্দুদের অনেক ভোট পাবে। আবার বিএনপির দিকেও কম হবে না।

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা পাহাড়িদের মধ্যে এবার ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত দেখা যাচ্ছে। খাগড়াছড়িতে পাহাড়ি নারী-পুরুষ-শিশুরা যেভাবে দাঁড়িপাল্লার সমর্থনে নেচে-গেয়ে মিছিল করছে তা এক কথায় কল্পনাকেও হার মানায়। এমনকি পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও চা শ্রমিকদের মতো পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মধ্যেও রাজনৈতিক সচেতনতা লক্ষ করা যাচ্ছে।

অতীতের মতো এবারো নারীদের ভোট সিদ্ধান্তমূলক ভূমিকা পালন করবে বলে মনে হয়। একসময় বেগম খালেদা জিয়া বিপুলসংখ্যক নারীর ভোট পেতেন। শেখ হাসিনা নারীদের মধ্যে কখনো জনপ্রিয় ছিলেন না। এবার নারীদের বৃহত্তর অংশ কোনদিকে যাবে। বিএনপিতে নারী প্রার্থী রয়েছেন ১০ জন। তারা নারী হিসেবে বিশেষ সুবিধা পাবেন কি না তা বলা মুশকিল। এদের অধিকাংশ পারিবারিক উত্তরাধিকার সূত্রে মনোনয়ন পেয়েছেন। ফলে মরহুম নেতার ইমেজ পুঁজি করে তাদের এগোতে হচ্ছে। অপর দিকে জামায়াত থেকে কোনো নারী প্রার্থী নেই। এটা নিয়ে জামায়াতকে বিভিন্নভাবে প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে। আবার জামায়াতের আমির ডা: শফিকুর রহমানের ব্যক্তিগত এক্স-অ্যাকাউন্ট হ্যাকড হয়ে নারীদের বিরুদ্ধে তার কথিত মন্তব্য নিয়ে ব্যাপক ঝড় সৃষ্টি হয়। বিএনপি এটাকে তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করেছে। তবে জামায়াতের যে বিপুলসংখ্যক নারীকর্মী রয়েছেন; তা বিভিন্নভাবে দৃশ্যমান হয়েছে। তারা বহু দিন আগে থেকে গ্রামে-মহল্লায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে নারীদের কাছে জামায়াতের প্রার্থীর অনুকূলে প্রচার চালাচ্ছেন। তাদের সক্রিয় তৎপরতা চোখে পড়ার মতো, যার কারণে বিএনপি কর্মীরা তাদের অন্যায়ভাবে বাধা দিয়েছে এবং আক্রমণ পর্যন্ত করেছে। এর ফলে বিএনপির ভোট বাড়বে নাকি কমবে তা ভোটের ফল থেকে দেখা যাবে। তবে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা শহরে জামায়াতের সমর্থনে নারীদের মিছিলে ব্যাপক উপস্থিতি থেকে মনে করা যেতে পারে, নারীদের মধ্যে জামায়াতের গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা বেড়েছে। রাজধানীর আধুনিক নারী এবং বিশ্ববিদালয়ের ছাত্রীরা ব্যাপক হারে যেভাবে জামায়াত ও শিবিরের প্রতি অনুরাগ দেখাচ্ছেন, তা রীতিমতো বিস্ময়কর। সুতরাং এবার নির্বাচনে নারীরা যে দিকে বেশি ঝুঁকে পড়বেন তাদের বিজয়ের সম্ভাবনা বেশি।

অন্য দিকে এবার তরুণদের ভোট রয়েছে প্রায় চার কোটি অর্থাৎ প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। তাদের ভোটও এবার সিদ্ধান্তমূলক হবে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শিক্ষার্থী ও তরুণদের ব্যাপক অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, তারা আওয়ামী ফ্যাসিবাদের প্রত্যাবর্তন চান না এবং ভারতের আধিপত্যও তারা মেনে নেবেন না। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অনেক দল, গোষ্ঠী ও ব্যক্তি-পরিবার সম্পৃক্ত থাকলেও সম্মুখ সারির পরিচিত যোদ্ধারা এনসিপি নামক রাজনৈতিক দল গঠন করেছেন। একই সাথে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটে যোগ দিয়ে নির্বাচন করছেন। ফলে তরুণদের একটি বড় অংশের ভোট তারা পাবেন বলে ধারণা করা যেতে পারে।

জাতীয় নেতা হিসেবে সামনের সারিতে চলে এসেছেন বিএনপি নেতা তারেক রহমান এবং জামায়াতের আমির ডা: শফিকুর রহমান। ধারণা করা হয়েছিল যে, দীর্ঘ ১৭ বছর পর বিলেত থেকে ফিরে তারেক রহমান একটি চমক দেখাবেন। একজন ক্যারিশম্যাটিক লিডার হিসেবে আবির্ভূত হবেন। স্বাধীনতার ঘোষক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ছেলে হিসেবে তারেক রহমানের অতিরিক্ত একটা সুবিধা ও ইমেজ রয়েছে। তা ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকার তাকে নিরাপত্তা দেয়ার নামে যে অতিরিক্ত সুবিধা দিয়েছে তা তাকে আরেকটু এগিয়ে দিলেও এ নিয়ে সমালোচনাও কম নয়। কারণ তারেক রহমান নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী একটি বড় দলের নেতা হলেও তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে তিনি অতিরিক্ত সুবিধা পেতে পারেন কি না; সে প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না। প্রশ্ন উঠেছে, নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিয়ে।

যাই হোক, তারেক রহমান ভোটারদের সামনে বিশেষ কোনো ম্যাজিক দেখাতে পেরেছেন বলে মনে হচ্ছে না। তিনি তার বক্তৃতায় ইসলাম ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয় তুলে এনে ম্যাজিক দেখানোর পরিবর্তে কিছুটা বিতর্কের মুখে পড়েছেন। ‘আমার একটি পরিকল্পনা আছে’— এর বহিঃপ্রকাশ কোন বিষয়ে ঘটেছে তা এখনো পরিষ্কার নয়। কারো কারো মতে, ‘ফ্যামিলি কার্ড’ সেই প্ল্যানটি হতে পারে। ‘ফ্যামিলি কার্ডের’ আইডিয়া কি ভোটারদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করতে পেরেছে? দলটির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বিষয়টি ভালোভাবে তুলে ধরতে পেরেছেন বলে মনে হচ্ছে না। তারেক রহমান বিভিন্ন জেলায় গিয়ে বিভিন্ন ভুল তথ্য দিয়ে বক্তব্য রেখেছেন, যা সোস্যাল মিডিয়ায় যথেষ্ট সমালোচনার কারণ হয়েছে। তার নির্বাচনী টিমে দক্ষ লোকের অভাব রয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়েছে। বিএনপি গণভোটের ব্যাপারে একটি অস্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে, যা তাদের সমর্থকদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে।

অন্য দিকে জামায়াতের আমির ডা: শফিকুর রহমান তার বক্তব্যের মাধ্যমে নিজের একটি ভাবমর্যাদা গড়ে তুলেছেন। জামায়াতের বাইরে আধুনিক লাইফস্টাইলের বহু নারী-পুরুষ তার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন বলে মনে হচ্ছে। তিনি চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটা কঠোর অবস্থান নিয়েছেন, যা অনেকে পছন্দ করছেন। জামায়াত নিজেদের দুর্নীতিমুক্ত হিসেবে একটা ভাবমর্যাদা গড়ে তুলতে পেরেছে। তারা সংস্কার তথা জুলাই সনদের অনুকূলে হ্যাঁ ভোট দেয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের টেলিভিশন বাগযুদ্ধ ভোটারদের পছন্দ-অপছন্দে প্রভাব ফেলে। আসন্ন নির্বাচন উপলক্ষে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর দুই নেতার টেলিভিশন ভাষণ কতটা প্রভাব ফেলে তা দেখতে আরেকটু অপেক্ষা করতে হবে।

লেখক : গবেষক ও সাবেক সচিব

ayubmiah@gmail.com