ড. শাহরিয়ার হোসেন
দক্ষিণ এশিয়ার তীব্র উষ্ণতা আর জনঘনত্বের চাপে ঢাকা আজ এক অদ্ভুত দ্বৈত বাস্তবতার শহর। এক দিকে আকাশছোঁয়া ভবন, ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের ঝলক; অন্য দিকে হারিয়ে যাওয়া জলাভূমি, বিষাক্ত বায়ু, মৃতপ্রায় নদী ও ধ্বংসপ্রাপ্ত জীববৈচিত্র্য। কয়েক দশকের ব্যবধানে ঢাকা একটি প্রশাসনিক শহর থেকে বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ মহানগরে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর প্রায় ১৫ লাখ মানুষ জীবিকার সন্ধানে গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় আসছে। এই অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ন শুধু নগর ব্যবস্থাপনাকেই চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেনি; বরং পুরো নগর প্রতিবেশ ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।
একসময় যে ঢাকা পাখির ডাক, খাল-বিল, সবুজ উদ্যান আর বৃক্ষছায়ার শহর ছিল, আজ সেখানে কনক্রিটের বিস্তার প্রকৃতিকে ক্রমাগত গ্রাস করছে। নগর উন্নয়নের নামে পার্ক, খেলার মাঠ, বাগান ও জলাভূমি হারিয়ে যাচ্ছে। প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে এবং জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে। এখন আর ভোরবেলা পাখির কূজন শোনা যায় না; তার জায়গা দখল করেছে যানজট, হর্ন ও নির্মাণযন্ত্রের কর্কশ শব্দ।
ঢাকার বায়ুদূষণ আজ শুধু একটি পরিবেশগত সঙ্কট নয়; এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য এক নীরব মহামারীতে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোর তালিকায় প্রায়ই ঢাকার অবস্থান উঠে আসে, বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে বাতাসে ক্ষুদ্র বস্তুকণা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিরাপদ সীমা বহুগুণ ছাড়িয়ে যায়। শিল্পকারখানা, অবৈধ ও নিম্নমানের ইটভাটা, পুরনো যানবাহনের কালো ধোঁয়া, ডিজেলচালিত পরিবহন, নির্মাণকাজের ধুলাবালু, রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি এবং খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ানো— সব মিলিয়ে ঢাকার বাতাস প্রতিদিন আরো বিষাক্ত হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাতাসে থাকা অতিক্ষুদ্র দূষিত কণা মানুষের ফুসফুস পেরিয়ে সরাসরি রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করতে পারে, যা হৃদরোগ, স্ট্রোক, ফুসফুসের ক্যান্সার, অ্যাজমা ও দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা বাড়িয়ে তোলে।
এই দূষণের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে শিশু, বয়স্ক মানুষ, গর্ভবতী নারী এবং নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠী। ঢাকার বহু শিশু এখন অল্প বয়সেই হাঁপানি, দীর্ঘস্থায়ী কাশি ও ফুসফুসের দুর্বলতায় আক্রান্ত হচ্ছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘসময় দূষিত বাতাসে বসবাস করলে শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ ব্যাহত হতে পারে, স্মৃতিশক্তি ও শেখার ক্ষমতা কমে যেতে পারে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। নিম্নআয়ের শ্রমজীবী মানুষ— যারা প্রতিদিন রাস্তাঘাট, কারখানা ও নির্মাণস্থলে দীর্ঘসময় কাজ করেন, তারা সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন। এদের বেশির ভাগেরই মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের সামর্থ্য নেই।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কেবল অস্থায়ী অভিযান বা মৌসুমি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও বিজ্ঞানভিত্তিক নীতি। প্রথমত, দূষণকারী ইটভাটাগুলো পর্যায়ক্রমে বন্ধ করে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে রূপান্তর নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, পুরনো ও ধোঁয়ানির্গত যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং গণপরিবহনব্যবস্থাকে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব করতে হবে। নির্মাণকাজে ধুলা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা, শিল্পকারখানায় নির্গমন মানদণ্ড কঠোরভাবে বাস্তবায়ন এবং নগরে ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণও জরুরি। একই সাথে বায়ুর গুণগত মান পর্যবেক্ষণে আধুনিক মনিটরিং ব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং জনগণকে নিয়মিত তথ্য জানানো প্রয়োজন। পরিষ্কার বাতাসকে নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। উন্নয়ন তখনই অর্থবহ, যখন তা মানুষের স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তাকে সমান গুরুত্ব দেয়।
জলদূষণের ক্ষেত্রেও ঢাকার পরিস্থিতি আজ ভয়াবহ ও গভীরভাবে উদ্বেগজনক। একসময় বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদী শুধু পানিপথ ছিল না; এগুলো ছিল ঢাকার অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও জীববৈচিত্র্যের প্রাণরেখা। এসব নদীর তীরে গড়ে উঠেছিল ব্যবসা-বাণিজ্য, মৎস্যজীবী সম্প্রদায়, কৃষিকাজ ও নগর সভ্যতার এক সমৃদ্ধ ঐতিহ্য। কিন্তু অপরিকল্পিত শিল্পায়ন, অবৈধ দখল, অপরিশোধিত ট্যানারি ও শিল্প বর্জ্য, হাসপাতালের বিষাক্ত বর্জ্য, মানববর্জ্য এবং প্লাস্টিক দূষণের কারণে আজ এসব নদী কার্যত জীবন্ত জলাশয় থেকে বিষাক্ত বর্জ্যরে ধারায় পরিণত হয়েছে।
নদীর পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় মাছ ও জলজ প্রাণীর মৃত্যু এখন নিয়মিত ঘটনা। খাল ও জলাধারগুলো দখল, ভরাট এবং পলিথিন-প্লাস্টিকে আটকে গিয়ে তাদের স্বাভাবিক প্রবাহ হারিয়েছে। এর ফলে জলাবদ্ধতা যেমন বাড়ছে, তেমনি ভূগর্ভের পানির পুনঃভরণও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ঢাকায় অতিরিক্ত ভূগর্ভের পানি উত্তোলনের কারণে পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতের জন্য ভয়াবহ পানি সঙ্কটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এই সঙ্কট থেকে উত্তরণের জন্য কেবল নদী খনন নয়, একটি সমন্বিত নগর পানিব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা জরুরি। শিল্পকারখানায় বাধ্যতামূলকভাবে কার্যকর Effluent Treatment Plant (ETP) চালু করতে হবে এবং দূষণকারী শিল্পের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। ঢাকার হারিয়ে যাওয়া খালগুলো পুনরুদ্ধার, জলাধার সংরক্ষণ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং বর্জ্য পৃথকীকরণ ও পুনর্ব্যবহার কার্যক্রমকে নগর ব্যবস্থাপনার বাধ্যতামূলক অংশ করতে হবে।
ঢাকার নগর সঙ্কটকে আরো ভয়াবহ করে তুলেছে জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমাত্রিক প্রভাব। অল্প বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি, তীব্র তাপপ্রবাহ এবং আকস্মিক বন্যা নগরবাসীর জীবনকে প্রতিনিয়ত দুর্বিষহ করে তুলছে। বিশেষ করে নিম্নাঞ্চল ও বস্তি এলাকাগুলো প্রায় প্রতি বর্ষাতেই প্লাবিত হয়। অপরিকল্পিত নগর বিস্তার, কনক্রিটনির্ভর উন্নয়ন এবং দুর্বল ভূব্যবস্থাপনা ঢাকাকে একটি ‘হিট আইল্যান্ড’ শহরে পরিণত করছে, যেখানে তাপমাত্রা আশপাশের অঞ্চলের তুলনায় বেশি অনুভূত হয়।
নগরের প্রাকৃতিক জলাধার ও বন্যাপ্রবণ এলাকা সংরক্ষণ, আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, পারমিয়েবল রাস্তা ও উন্মুক্ত সবুজ এলাকা বৃদ্ধি এবং নগরে জলধারণক্ষম অবকাঠামো নির্মাণ অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি সৌরশক্তি, সবুজ ভবন, শক্তি-সাশ্রয়ী নগর অবকাঠামো এবং গণপরিবহনভিত্তিক উন্নয়ন মডেল গ্রহণ করলে কার্বন নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি নগর জীবনও আরো সহনীয় হয়ে উঠবে।
নগর উদ্যান, ছাদবাগান, কমিউনিটি গার্ডেন, উন্মুক্ত সবুজ এলাকা এবং জলাধার শুধু সৌন্দর্যের উপাদান নয়; এগুলো নগরের ‘সবুজ অবকাঠামো’ হিসেবে কাজ করে। গবেষণায় দেখা গেছে, সবুজ পরিবেশ মানুষের মানসিক চাপ কমাতে এবং সামাজিক সংযোগ বৃদ্ধি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ঢাকার আশপাশের নদী, জলাভূমি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। সংরক্ষিত এলাকা বৃদ্ধি, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, শিল্পদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধারে সরকার, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, গবেষক ও নাগরিক সমাজের সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। বিশেষ করে জলাভূমি ও নদী ব্যবস্থাপনাকে কেবল উন্নয়ন প্রকল্পের অংশ হিসেবে নয়, জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
স্থানীয় জনগণ, তরুণ সমাজ, পরিবেশকর্মী ও গবেষকদের সম্পৃক্ত করে নগর পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় অংশগ্রহণমূলক কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। পরিবেশবিধ্বংসী প্রকল্প অনুমোদনের আগে বাধ্যতামূলক পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
শুধু সরকারের ওপর দায় চাপিয়ে দিলেই চলবে না; ব্যবসায়-প্রতিষ্ঠান, শিল্প মালিক ও নাগরিকদেরও এগিয়ে আসতে হবে। শিল্প খাতে পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার, বর্জ্য পুনঃব্যবহার, জ্বালানি ও পানি সাশ্রয়, টেকসই সরবরাহ ব্যবস্থা এবং করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতাকে বাস্তব কার্যক্রমে রূপ দিতে হবে। ‘গ্রিন ইকোনমি’ ও ‘সার্কুলার ইকোনমি’-ভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে একই সাথে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব। নাগরিকদেরও প্লাস্টিক ব্যবহার কমানো, গণপরিবহন ব্যবহার, বৃক্ষরোপণ, পানি অপচয় রোধ ও পরিবেশবান্ধব জীবনচর্চা গড়ে তোলার মাধ্যমে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
ঢাকাকে বাসযোগ্য, মানবিক ও পরিবেশবান্ধব নগরীতে পরিণত করতে হবে; যা নদী হত্যা করে নয়; বরং নদী ও নগরের সহাবস্থান নিশ্চিত করে।
দূরদর্শী পরিকল্পনা, বিজ্ঞানভিত্তিক নীতি, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি এবং সামাজিক সচেতনতার সমন্বয়ে ঢাকা এখনো একটি টেকসই, প্রাণবন্ত ও মানবিক নগরীতে রূপ নিতে পারে— যেখানে উন্নয়ন ও প্রকৃতি পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং সহযাত্রী।
লেখক : পরিবেশবিজ্ঞানী



